যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান বাহিনী শনিবার রাত বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের চারটি তেল ডিপো ও এক পেট্রোলিয়াম পরিবহন কেন্দ্র লক্ষ্য করেছে। ওই হামলায় অন্তত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে দেশটির সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
ইরানের জাতীয় তেল উত্তোলন ও বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেরামাত বিয়েসকারামি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকারে এই ঘটনাটি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তেহরান ও আলবোর্জ প্রদেশে বিস্ফোরণ ও আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে; নিহতদের মধ্যে দুজনই তেল ট্যাংকার চালক বলে জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) পৃথক বিবৃতিতে অভিযানের কথা স্বীকার করে বলে জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও সক্ষমতা ক্ষুণ্ন করা ছিল। সামাজিক যোগাযোগমాధ্যে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায় ডিপোগুলোতে প্রচুর আগুন জ্বলছে এবং আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঁচু হয়েছে। এই হামলার ফলে ইরানের জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পতাকাবাহী টাগবোট—মুসাফাহ-২—ডুবে গেছে। জাহাজটিতে মোট সাতজন ছিলেন; ওই ঘটনায় চারজনকে উদ্ধার করা হয়েছে, তিনজন ইন্দোনেশীয় নাবিক এখনও নিখোঁজ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানানো হয়, ডুবার আগে জাহাজটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং পরে আগুন ধরে যায়। নিরাপত্তা সংস্থা ভ্যানগার্ড টেক বলেছে, মুটামুটি সময় একই এলাকায় মাল্টার পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ সাফিন প্রেসটিজকে সাহায্য করতে যাওয়ার সময় টাগবোটটি দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংকে ড্রোন হামলার ফলে রবিবার ভোরে আগুন লাগে, যা পরে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কুয়েত সরকার দুই জন সীমান্ত নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বলেছেন, দেশের আকাশসীমা শত্রুভাবাপন্ন ড্রোনের ঢেউয়ের মুখে পড়েছে এবং বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
একই সময় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের তেল আবিব ও বিয়ারশেবা এলাকার সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল এবং জর্ডানের আজরাকের মুওয়াফফাক আল-সালতি বিমানঘাঁটিতেও আক্রমণ করেছে। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে মাল্টা ও মার্শাল আইল্যান্ড পতাকাবাহী দুটি তেল জাহাজে আঘাত হানা হয়েছে এবং বাহরাইনের মানামায় কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব দাবি বিভিন্ন পক্ষ থেকে এসেছে এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢুকেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ইরানকে ‘‘খুবই কঠোরভাবে আঘাত’’ করার হুমকি জানিয়েছিলেন এবং আরও উচ্চস্তরের আঘাত ও নেতাদেরকে লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। এর বিপরীতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বারবার বলেছেন, ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের আক্রমণে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, যদি এসব দেশ ইরানকে লক্ষ্য করে না, তেহরানও পাল্টা হামলা চালাবে না।
যুদ্ধ জুড়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন বিস্তীর্ণ আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন তথ্যমতে ইরান ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলে অন্তত ২৯ জন নিহত হয়েছেন; সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের আল-বারশা এলাকায় ভূপাতিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক জন নিহত হয়েছেন। ইরানে নিহতদের চূড়ান্ত সংখ্যা নিয়ে রোববার কোনো নতুন হালনাগাদ দেওয়া হয়নি; শুক্রবার পর্যন্ত দেশটিতে ১ হাজার ৩৩২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বলে রিপোর্ট জানানো হয়েছিল।
উভয়পক্ষের তরফ থেকে কর্ণাটক কড়াকড়ি ও আক্রমণের হুমকি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত থেকে গেছে। ঘটনাবলি দ্রুত পরিবর্তনশীল; দফায় দফায় আসা দাবি ও প্রতিক্রিয়ার আলোকেই ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণ হবে।








