ঢাকা | বুধবার | ১১ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২২শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে ১৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা: সিপিডির উদ্বেগ

সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির ফলে চলতি অর্থবছরেই সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। আজ মঙ্গলবার ঢাকার ব্র্যাক ইন সেন্টারে আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সুপারিশমালা’ শীর্ষক এক আলোচনাসভায় সংস্থাটির এই চিন্তার কথা তুলে ধরা হয়। তারা মনে করে, এই চুক্তির ফলে শুধু সরাসরি রাজস্ব ক্ষতি নয়, বরং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতি সম্পর্কিত কৌশলেও নতুন বাঁধা সৃষ্টি হতে পারে।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি জানান, অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেডের আওতায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া ৪৫০০ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। তবে আগামী ১০ বছর মধ্যে আরও ২১০০ পণ্যে এই সুবিধা দিতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এই একপাক্ষিক সুবিধা দেওয়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এর ফলে অন্যান্য সদস্য দেশগুলোও যদি এই সুবিধা পায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে বাধ্য হলে সরকারের ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

এছাড়া, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর দিয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপির বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০.৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। একইভাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যেখানে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৩৪.৫ শতাংশ, সেখানে এই সময়ে আদায় মাত্র ১২.৯ শতাংশ। এর ফলে অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ইতিমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। রাজস্ব কম হওয়ায় সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে, যার পরিণামে ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণের পরিমাণ পৌঁছে গেছে ৫৯৬৫৫ কোটি টাকায়। এই ঋণ বাড়ার ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমে যাচ্ছে এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য ঝুঁকিতে পড়ছে।

অপরদিকে, দেশের বাইরের বাণিজ্য পরিস্থিতির আশঙ্কাতেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি। অর্থবছরের এই সময় আয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমদানির ব্যয় বেড়েছে ৩.৯ শতাংশ, যেখানে রপ্তানি হয়েছে ৩.২ শতাংশ হ্রাস। মাঝপথে চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবও পড়েছে এই পরিস্থিতিতে। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট হলে মূল্যবৃদ্ধি আরও বেশি আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা বা প্রভাব তৈরি হওয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশনা ও এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তির পুনঃমূল্যায়নের বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সংস্থাটি সরকারের উদ্দেশ্যে আরও পরামর্শ দিয়েছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের পরিকল্পনায় উচ্চাভিলাষী আশাবাদের পরিবর্তে বাস্তবমুখী ও সুসংগঠিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে। বর্তমান সরকার যদি কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশ করার লক্ষ্যে কাজ করে, তবে তা বাস্তবে এখন ৬.৮ শতাংশেই সীমাবদ্ধ। এই বিরাট ব্যবধান কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও নিবিড় কর প্রশাসন ব্যবস্থা। এছাড়া অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমিয়ে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করার উপর জোর দেওয়ারও পরামর্শ দেয়া হয়। সংস্থাটির মতে, এভাবেই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।