ঢাকা | শনিবার | ২৫শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১১ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষে নিহত ১২: মৃতদের মধ্যে যশোরের পাঁচজন

কুমিল্লার সদর দক্ষিণে রাত পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘর সূত্রে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা জানান, আহত হয়েছেন আরও ১০ থেকে ১৫ জন।

নিহতদের মধ্যে যশোর জেলার পাঁচজন রয়েছেন—লাইজু আক্তার (২৬), তার দুই মেয়ে খাদিজা (৬) ও মরিয়ম (৩), চৌগাছার সিরাজুল ইসলাম (৭০) এবং কোহিনূর বেগম (৫৫)। এ ছাড়া নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির বাবুল চৌধুরী (৫৫) ও ফাজিলপুরের নজরুল ইসলাম রায়হান (৪৫) নিহত তালিকায় আছেন। বাকি নিহতরা হলেন চাঁদপুরের তাজুল ইসলাম (৬৭), ঝিনাইদহের জুহাদ বিশ্বাস (২৪), মাগুরার ফচিয়ার রহমান (২৬), চুয়াডাঙ্গার সোহেল রানা (২৫) এবং লক্ষ্মীপুরের শিশু সাঈদা (৯)।

প্রাথমিক তদন্ত ও স্থানীয় বিবরণ অনুযায়ী, ওই রেলক্রসিংয়ে গেট না থাকায় বাসটি রেললাইনে ওঠে। পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আহত ও স্থানীয়দের বর্ণনায় দেখা গেছে ট্রেন বাসটিকে মোটামুটি আধা কিলোমিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে।

দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কাজ শুরু হয়। রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আখাউড়া থেকে আসা উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান চালায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন সরিয়ে নেওয়ার পর সকাল ১১টার পর রেল চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। আটকে থাকা মহানগর প্রভাতি ও কর্ণফুলী ট্রেনও পরে গন্তব্যে রওনা দেয়।

ঘটনাস্থলে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও রেলে নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত থেকে উদ্ধার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে দেখা যায় রেলক্রসিংয়ের প্রতিবন্ধক অক্ষত থাকলেও ভাঙা কাঁচ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, বাসের দুটি চাকা রেললাইনের কাছেই পড়ে আছে এবং রেলের কর্মীদের একটি কক্ষ তালাবন্ধ মিলেছে।

প্রাথমিক তদন্তে রেলওয়ে ও স্থানীয়রা বলছেন গেটম্যান ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়েছিলেন। ঘটনার পর দুই গেটম্যান—মেহেদি হাসান ও হেলাল উদ্দিন—কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বিভাগীয় ও জোনাল দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত চলমান। যারা অবহেলায় ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান জানান, আহতদের মধ্যে ১৮ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর বাড়ি পাঠানো হয়েছে, বর্তমানে পাঁচজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য জেলা প্রশাসন ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছে। এছাড়া অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিক্সট্রেট মো. জাফর সাদিক চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলগেটের দায়িত্বে থাকা সিগন্যালম্যানের অবহেলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ একাধিকবার ফোন করলেও সাড়া মেলেনি।

ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, তাঁদের প্রাথমিক ধারণা বাসচালকের ভুলও ছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে তিনটি দেহ উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান; তার আগে পুলিশ ও স্থানীয়রা আরও কয়েকটি দেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। তদন্তকারীরা দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।