ঢাকা | শুক্রবার | ২৭শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৮ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

হরমুজের পর এবার বাব আল-মান্দেব অবরোধের হুঁশিয়ারি ইরান

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম সংবেদনশীল রুট হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করার পর এবার বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবরোধের সতর্কতা দিয়েছে ইরান। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ আইআরজিসি-র (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস) বরাত দিয়ে এই তথ্য প্রকাশ করে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়েছে।

আইআরজিসি-র একটি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ফার্স নিউজকে বলেছেন, যদি শত্রুপক্ষ ইরানের কোনো দ্বীপপুঞ্জে বা মূল ভূখণ্ডে স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করে অথবা পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে তাদের সামরিক কার্যক্রম বাড়ায়, তা হলে ইরান কেবল প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, সম্ভবত বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নতুন একটি সামরিক ফ্রন্ট খুলে দেবে। এই মন্তব্যটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর বিশাল ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে বিতর্কিত আভাস দিচ্ছে।

ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাব আল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী বিশ্বজ্বালানির প্রায় ১২ শতাংশ তেল ও গ্যাস অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ পরিমাণ অতি সংবেদনশীল এই রুটে চলাচল করে; তাই এটি যদি বন্ধ বা বিঘ্নিত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির যোগান ও মূল্য ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও ইয়েমেন তেহরানের সরাসরি সীমানার কাছে নেই, তবু ওই অঞ্চায় ক্ষমতাসীন হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে তেহরান সামগ্রিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। আইআরজিসি-র কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ইতোমধ্যে হুথি নেতাদের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনার পর তাঁরা ইরানের পক্ষে সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন। আইআরজিসি আরও জানিয়েছে যে, হুথিদের হাতে থাকা আধুনিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংকীর্ণ এই জলপথে যেকোনো সময় জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব।

এমন পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও নৌবাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তারা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—এই দুটি যৌথভাবে অবরুদ্ধ হলে না শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্য বরং ইউরোপ ও এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ চিত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে; পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।

তেহরানের এই কৌশলকে অনেকেই এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ’ হিসেবে দেখছেন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের পাল্টা হিসেবে ইরান এই পথ অবরোধকে ব্যাবহার করার পরিকল্পনা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতিমধ্যেই এই ঘটনার ওপর সতর্ক নজর রাখছে এবং কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে প্রতিক্রিয়ার সম্ভাব্য পথগুলো বিশ্লেষণ করছে।

বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। বিশ্লেষকরা সবাই একমত যে, যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা সমুদ্রপথগুলোর নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এখন দরকার সত্বর কূটনৈতিক উদ্যোগ ও সংঘাত কমানোর তৎপরতা, যাতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোকে নিরাপদ রাখা যায় এবং বিশ্ববাজারে বড় ধরণের অস্থিরতার ঝুঁকি এড়ানো যায়।