ঢাকা | শনিবার | ২৫শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১১ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

অর্থনীতির সামনে ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব খুব বেশি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, ফলে দেশে এখন ত্রিমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার কর ফাঁকি রোধ এবং বিনিয়োগ আকৃষ্টের জন্য একযোগে কাজ করছে। পাশাপাশি, তারা দেশের অর্থনীতিতে ঋণনির্ভর নির্মাণের পরিবর্তে বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার চেষ্টাও চালাচ্ছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণের প্রত্যাশাগুলো রক্ষা করা। তবে, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তারা নতুন করে টাকা ছাপিয়ে বাজারকে চাঙ্গা করতে আগ্রহী নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ঝুঁকি নিতে পারে তেলশূন্যতার। এতে করে উৎপাদন খরচ ও পরিবহন খরচের চাপ বৃদ্ধি পাবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।

অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটের কারণেও দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ডলার সংকট এবং টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানির খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে ভোগ্যপণ্যমূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে জ্বালানি ও অপরিশোধিত পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরো কঠিন হয়ে উঠবে।

বৈশ্বিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে, যার ফলে দেশের রপ্তানি ও বিদেশি আয়ে ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। অনেক দেশের মধ্যে অসন্তোষ এবং অস্থিরতার কারণে এই সঙ্কট দেশের অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, তারা ঋণনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে বিনিয়োগ ভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে। তবে, তারা নতুন করে টাকা ছাপাতে একদমই আগ্রহী নন। বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যার জন্য প্রধানমন্ত্রী একটি চিঠি পাঠাবেন যাতে এই প্রকল্পের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছানোর অনুমোদন পাওয়া যায়, যা পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পেশ করা হবে। এই বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তবে এগোচ্ছেই।

মন্ত্রী জানিয়েছেন, আসন্ন বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নারীদের উদ্যোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মতো ক্ষেত্রগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি জনবান্ধব বাজেট প্রণয়নের কাজ চলমান। বিশেষ করে, সমাজের বঞ্চিত মানুষদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিনিয়োগ ও নীতিমালার স্থিতিশীলতা আনতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে বিনিয়োগ করতে পারে। পাশাপাশি, পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং বড় ধরনের ডিরেগুলেশন (নিয়ম পরিবর্তন) আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা এবং দারিদ্র্য সীমার নিচে থাকা মানুষদের জন্যও বিভিন্ন কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে বঞ্চিত মানুষদের সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

রপ্তানি খাতে এখনো মূলত গার্মেন্টসের উপর ভরসা থাকলেও, এ খাতের বহুমুখীকরণে কাজ চলছে। অন্যান্য সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতগুলোকে উৎসাহিত করতে নতুন সুবিধা আনা হচ্ছে, যেমন বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য জাপান ও জার্মানির রাষ্ট্রদূতদের সাথে আলোচনা চলছে, বিশেষ করে এই সংকটের মুহূর্তে তাদের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।

পুঁজিবাজারের ব্যাপারে জানান, আগে নিয়মকানুনের বারবার পরিবর্তনে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হয়েছিল। এখন সরকার নিয়ম-কানুনের স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে।

অবশেষে, সরকারের লক্ষ্য হলো বঞ্চিত সম্প্রদায়ের জন্য বাজেটের প্রথম ভাগ বরাদ্দ দেওয়া। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী, তাদের জন্য মূল দিকগুলো অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এতে করে একদিকে নির্বাচনের আগে বিদেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।