ঢাকা | বুধবার | ১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২রা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে সমঝোতায় অগ্রগতি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির দিকে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। দুই দেশের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা রয়েছে এবং কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে ১৯ জুন এই খসড়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা চালানো হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। তিনি দাবি করেছেন, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে তীব্রভাবে চলা সংঘাতকে থামাতে সহায়তা করবে এবং পরবর্তীতে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা এগোবে।

দوسরি পক্ষে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানি জনগণের দৃঢ় অবস্থান ও প্রস্তুতির কারণে প্রতিপক্ষ কিছুটা পিছু হটেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলতি খসড়া সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সমঝোতা কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও তা গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে তেল চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাজারে চাপ পড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়েছে।

খসড়া অনুযায়ী প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে: তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া, এবং ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধাপে প্রত্যাহার। সামরিক ও কৌশলগত পর্যায়ে ইরান অবিলম্বে বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেবে—তবে আগে সেখানে থাকা মাইন অপসারণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। প্রণালীটি স্বাভাবিক হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে জারি রাখা নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং তেল পরিবহন পুনরায় চালু হবে।

অর্থনীতির শর্তগুলোতে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তি সম্পাদিত হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইরানের তেল রপ্তানি সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাও উঠিয়ে দেওয়া হবে, যাতে তেহরান আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করে রাজস্ব নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে।

এছাড়া ওয়াশিংটন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের অংশ ধাপে ধাপে ছাড়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। এই অর্থ নগদ হস্তান্তর, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বিশেষ ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হতে পারে।

পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়ে তেহরান এই খসড়া চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থাই বজায় রাখবে—অর্থাৎ এই সময়ে নতুনভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পরমাণু স্থাপনাগুলোর পরিধি বিস্তার করা হবে না।

চুক্তির খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তেলের দাম দ্রুত কমেছে—ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩.৬৫ ডলার বা প্রায় ৪.২ শতাংশ কমে ৮৩.৬৮ ডলারে নেমে আসে। একই সঙ্গে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম প্রায় ৪.৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০.৭৫ ডলারে দাঁড়ায়। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালী খুলে গেলে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারে চাপ কমতে পারে, ফলে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে—জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক প্রায় ৫.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি প্রায় ৫.৭ শতাংশ বেড়েছে। তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া ও হংকংয়ের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। মার্কিন বাজারেও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও প্রযুক্তিনির্ভর নাসদাক সূচকের ফিউচার লেনদেনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে।

যুদ্ধের আশঙ্কা কমার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারও অন্যান্য প্রধান মুদ্রার তুলনায় কিছুটা দুর্বল হয়েছে, ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপও সামান্য হ্রাস পেতে পারে—এমনটাই মনে করছেন কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার।

তবে অনূঠিত চূড়ান্ত সমঝোতা এখনও কার্যকর হয়নি; খসড়া অনুমোদনের পরও দুই পক্ষের মধ্যে প্রতিটি শর্ত বাস্তবায়ন ও নজরদারি সংক্রান্ত আলোচনায় সময় লাগবে। এই প্রক্রিয়ার সফল বাস্তবায়ন হলে তা মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়ক হিসেবে দেখা হবে।