ঢাকা | বুধবার | ১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২রা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

প্রথমবারের মতো ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো শহর থেকে সরছে

দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভয়াবহ যানজট, অব্যবস্থাপনা এবং শব্দ দূষণের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকার حياة। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে সরকার একটি ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণের পথে রয়েছে। এর আওতায় ঢাকার প্রবেশদ্বার এবং অভ্যন্তরীণ ট্রাফিক সমস্যার মূল কারণ হিসেবে পরিচিত সায়দাবাদ, গুলিস্তান এবং মহাখালী বাস টার্মিনালগুলো ঢাকার ভিতর থেকে পর্যায়ক্রমে সরিয়ে দেশের বাইরে বা উপযুক্ত উপকণ্ঠস্থ স্থানগুলোতে স্থানান্তর করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলা সহজ হয়।

সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের ‘যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন’ বৈঠক শেষে এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় ট্রাফিক ব্যবস্থা সংস্কার ও আধুনিক নগর পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের উপর গভীর আলোচনা হয়। সভার শেষে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই ব্যাপক পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন।

যানজটের মূল উৎসসমূহ দূর করার জন্য এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও ধীরগতি সম্পন্ন শহর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার প্রধান কারণ শহরের ভৌগোলিক বিন্যাস ও অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিবহন ব্যবস্থা। মূল প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ বাস টার্মিনালগুলো—সায়দাবাদ, গুলিস্তান ও মহাখালী—দীর্ঘ দিন ধরে যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার বাস এই টার্মিনালগুলোতে প্রবেশ করে ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে অবনতির দিকে রাস্তার চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে যানজট সৃষ্টি হয় এবং লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক প্রধান প্রতিবন্ধকতা।

সরকার এই সংকট সমাধানে ঢাকার বাইরে পৃথক প্রান্তিক স্থানে এসব টার্মিনাল পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নিয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে কাঁচপুর (উত্তর ও দক্ষিণ), কেরানীগঞ্জ (বাউরিয়া), সাভার (হেমায়েতপুর বা আমিনবাজার), এবং গাজীপুর বা বাউলিয়া সংলগ্ন এলাকাগুলো এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হবে। এগুলোর নির্মাণ হলে দূরপাল্লার বাসগুলো সহজে শহরের বাইরে থেকে যাত্রী নামিয়ে, আবার ফিরে যেতে পারবে, ফলে শহরের ভেতরের যানজট প্রায় ৮০ শতাংশ কমে আসবে।

তবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন, বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ, উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ এবং বহুসংখ্যক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে সমঝোতা। দূরপাল্লার যাত্রীরা যখন শহরের বাইরে নামবেন, তখন তাদের শহরভিত্তিক সহজ লিঙ্ক বা সংযোগের ব্যবস্থা করতে হবে, যেমন আন্তঃমেট্রোরেল, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট বা চক্রাকার বাস সার্ভিস। নগর পরিকল্পনাবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তের ভালো দিক দেখতে পাচ্ছেন, তবে সতর্ক করে বলেছেন, শুধু টার্মিনাল স্থানান্তর ঘটিয়ে ঢাকার যানজট কমবে না; এর সঙ্গে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা এও মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত ঢাকার ট্রাফিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে পারে। দ্রুত প্রান্তিক টার্মিনালগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দূরপাল্লার যাত্রীরা শহরের ভেতরে সহজে আসা-যাওয়া করতে পারে। মেট্রোরেল, র‍্যাপিড ট্রানজিট বা বিশেষ প্রয়োজনীয় বাস সার্ভিসের সংযোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি ঢাকার অভ্যন্তরীণ বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাও জরুরি।

প্রতিবেশী দেশসমূহে এই ধরনের উদ্যোগ ইতোমধ্যে সফল হয়েছে, এবং এই মহাপরিকল্পনা নিয়মিত, দুর্নীতিমুক্ত ও সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকাকে একটি আধুনিক, যানজটমুক্ত, দূষণমুক্ত শহরে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। সরকারের এই দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যতে ঢাকাবাসীর জন্য থাকবে আরামদায়ক, শান্তিপূর্ণ ও আধুনিক জীবনযাত্রার আশা।