পৃথিবীর মতো কিছু মিল থাকা সত্ত্বেও মঙ্গলের জীবনের অস্তিত্ব কেন নেই, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বহুকাল ধরেই নানা প্রশ্ন ও খোঁজ চলছে। সম্প্রতি নাসার এক রোভার এমন একটি তথ্য উন্মোচন করেছে, যা এই যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেছে।
ফ্রান্সের প্যারিস থেকে এএফপির রিপোর্ট অনুযায়ী, নতুন গবেষণায় প্রকাশ পাচ্ছে, মঙ্গলে এক সময় অল্প সময়ের জন্য নদী ও হ্রদ প্রবাহিত হলেও, গ্রহটি অধিকাংশ সময় মরুভূমির মতোই শুষ্ক ও অনুকূলহীন পরিবেশে পরিণত হয়েছিল। এই পরিবেশ প্রাণের বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী যথেষ্ট ছিল না।
মঙ্গলের ভূখণ্ডে প্রাণ গঠনের প্রয়োজনীয় উপাদান, যেমন কার্বন এবং অন্যান্য খনিজ পাওয়া গেলেও, সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যই তরল পানি পাওয়া যেতো। প্রাচীন নদী এবং হ্রদের অনুসন্ধানে স্পষ্ট যে একসময় পানি প্রবাহিত হয়েছিল, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী ছিল না।
এই বছরের শুরুতে নাসার কিউরিওসিটি রোভার এমন কিছু শিলা আবিষ্কার করে, যেখানে কার্বনেট খনিজের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। পৃথিবীতে এই ধরনের খনিজ যেমন লাইমস্টোন বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে শিলায় আটকে রাখে।
গবেষণা ফলাফল ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বিজ্ঞানীরা কার্বনেট শিলার মাধ্যমে মঙ্গলের আবহাওয়া এবং জলবায়ুর পরিবর্তন মডেল করেছেন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহবিজ্ঞানী এডউইন কাইট বলেন, ‘মঙ্গলে কিছু নির্দিষ্ট সময় এবং স্থানে স্বল্পকালের জন্য বসবাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি হয়, তবে তা ছিল একেবারে ব্যতিক্রম।’
পৃথিবীতে কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমণ্ডলকে উষ্ণ রাখে এবং প্রাকৃতিক চক্রের মাধ্যমে জলবায়ু ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু মঙ্গলে আগ্নেয়গিরির গ্যাস নিঃসরণ কম হওয়ার কারণে এই বিষয়টি ব্যাহত হয়। মডেল অনুযায়ী, মঙ্গলে তরল পানির সংক্ষিপ্ত উপস্থিতির পর প্রায় ১০ কোটি বছর ধরে গ্রীষ্মমন্ডল থেকে শুষ্ক মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে, যা প্রাণ টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত কঠিন পরিবেশ তৈরি করেছে।
কাইট আরও উল্লেখ করেন, মহামূল্যবান তরল পানির অস্তিত্ব এখনও মঙ্গলের গভীর অংশে থাকতে পারে, যা আমরা এখনো আবিষ্কার করতে পারিনি। নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভার ২০২১ সালে মঙ্গলের একটি প্রাচীন ডেল্টায় অবতরণ করে এবং সেখানে কার্বনেটের চিহ্ন আবিষ্কার করে।
বিজ্ঞানীরা এখন আরও বেশি কার্বনেট খুঁজে পেতে চেষ্টা করছেন, যার সফলতার জন্য শিলাগুলো মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে এনে বিশ্লেষণের প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আগামী এক দশকের মধ্যে এই উদ্দেশ্যে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চাচ্ছে।
এই অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন হল পৃথিবীর মতো প্রাণবাহী গ্রহ সত্যিই বিরল? ১৯৯০-এর দশক থেকে বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের বাইরের প্রায় ৬ হাজার গ্রহ আবিষ্কার করেছেন, কিন্তু পৃথিবী ও মঙ্গলে এমন শিলানিরীক্ষা সম্ভাবনা রয়েছে যা তাদের অতীতকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।
কাইট বলেন, ‘যদি প্রমাণিত হয় যে মঙ্গলের পানিপূর্ণ যুগেও প্রাণ জন্মায়নি, তাহলে বোঝা যাবে মহাবিশ্বে জীবনের গঠন কতটা কঠিন। আর যদি প্রাচীন কোনো প্রাণের নিদর্শন পাওয়া যায়, তবে তা জীবনের বিস্তার সহজ হওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেবে।’








