ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের শেষ বিদায়

অশ্রু, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় দেশের প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, পাপেট আন্দোলনের প্রখর আগ্রহী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষের বিদায় জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার ভোরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রাঙ্গণে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, এরপর তার মরদেহ নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ভিড় জমান, এবং এই উপস্থিতিতে তৈরি হয় এক আবেগময় পরিবেশ।

এর আগে সকাল ৮:৫৫ মিনিটে বিটিভি প্রাঙ্গণে তাঁর মরদেহ আনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে তার সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং বিভিন্ন অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে যান। সকাল ৯:৫২ মিনিটে তাঁর প্রথম জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয়।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, সংবাদমাধ্যমের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ, নাট্য ব্যক্তিত্ব ম হামিদসহ অনেক শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রতিনিধি।

বেলা ১১টার দিকে মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয়, যেখানে সর্বস্তরের মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, তারিক আনাম খান, নিমা রহমান, ত্রপা মজুমদার, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দীন স্টালিন ও বিখ্যাত শিল্পী মনিরুল ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তিরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এছাড়াও, দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন যেমন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গোলাম মোস্তফা একাডেমি, পাঠশালা, সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, প্রাচ্যনাট, বটতলা, দূরন্ত স্টেশন ও বঙ্গরঙ্গ নাট্যদলসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান পুষ্পস্তবক অর্পণ করে এই গুণী ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রকাশ করেন।

দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানো শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে, সেখানে দ্বিতীয় জানাজার আয়োজন করা হয়। এরপর তাঁর মরদেহ উপবাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ও চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বনানী কবরস্থানে দাফন কাজ সম্পন্ন হয়।

বিশিষ্ট এই শিল্পী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গত সোমবার রাজধানীর এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন ছবি শিল্পীই ছিলেন না, তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শক। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শিল্প ও সংস্কৃতিকে মুক্তির সংগ্রামের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ, পাকিস্তানি শাসনের কঠোর নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সম্প্রচারকক্ষে সাহসী ভূমিকা পালন করেন তিনি।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই গুণী শিল্পী শিশু শিল্পীরা জন্য জনপ্রিয় পাপেট থিয়েটারকে উন্নীত করেন এবং তার দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য প্রামাণ্য টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ করে সারাবিশ্বের নজর কাড়েন। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে তিনি অবজেক্ট হিসেবে একুশে পদক প্রাপ্ত হন।