দেশে প্রবাসী আয় বাড়ায় এবং টাকা পাচার নিয়ন্ত্রণে আসায় ৪৫ মাস পর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপরে যেতে সক্ষম হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী মোট (গ্রস) রিজার্ভ এখন ৩৭ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার, এবং আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুসারে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন (৩২,৪৭৯.৮৮ মিলিয়ন) ডলার। ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ আছে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার।
গত ১২ মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। একমাত্র রেমিট্যান্স নয়—বৈধ পথে জমা বাড়ানো, হুন্ডি ও অবৈধ টাকা পাচার কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রচেষ্টাও রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী চলতি মাসের শুরুতে (১ জুন) মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী ছিল ৩০ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। এক মাসের মধ্যে মোট রিজার্ভ প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেলে ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ সর্বোচ্চ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছিল। পরে অনিয়ন্ত্রিত টাকা পাচার, হারোয়ানিক হুন্ডি কার্যক্রম ও অন্যান্য কারণে রিজার্ভ ক্রমশ কমে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, সরকারের পাল্টার সময় মোট রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে; আইএমএফের বিপিএম-৬ অনুযায়ী তখন রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ২৯ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ রেখে যায়।
এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে ডলারের বিনিময় হার ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক করা হয়, আমদানির ওপর আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে শিথিল করা হয় এবং প্রবাসী আয় বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি হুন্ডি প্রতিরোধ ও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স জমা বাড়াতে নানা তদবির করা হয়েছে।
সরকার প্রবাসী রেমিট্যান্সকে বৈধ চ্যানেলে আনার জন্য ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক আয় বৈধ পথে দেশে ফিরিয়ে আনা, মানিলন্ডারিং রোধ করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনমানুষের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার কমে যাওয়া এবং বৈধ-অবৈধ পথে ডলারের মুল্যের পার্থক্য হ্রাস পাওয়াও রেমিট্যান্স বাড়ার একটি বড় কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, হুন্ডি কার্যক্রম কমে যাওয়ায় ও বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ হওয়ায় প্রবাসী আয় বেড়েছে এবং তা রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও সংকেত দিয়েছেন যে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় লেটার অব ক্রেডিট খোলার ক্ষেত্রে সহজ হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক পথে ফিরছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, হুন্ডি প্রতিরোধ ও টাকা পাচার রোধে চলমান কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আরও বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল থাকবে। রিজার্ভের এই পুনরুদ্ধার টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ ফেরাতে কৌশলগতভাবে কাজে লাগবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।








