ঢাকা | রবিবার | ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

অবশেষে আলো দেখলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা, শুরু হবে ২০২৬ সালে

উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২ কোটি মানুষের জীবনযাত্রা নির্ভরশীল তিস্তা নদীর ওপর। কৃষক থেকে জেলেরাও এই নদীর পানির ওপর নির্ভর করেন তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীর উপর ভাঙনের ফলে অসংখ্য মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি ধ্বংস হচ্ছে, যা তাদের জীবনকে আরও বিভীষিকাময় করে তুলেছে। এই সংকটময় পরিস্থিতির কারণে নদীর তীরে বসবাসকারী মানুষজনের একটাই আকাঙ্ক্ষা — তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন।

সব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা পেরিয়ে অবশেষে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শুরু হবে ১০ বছরের মেয়াদে পরিচালিত ১২ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ, যেখানে বিনিয়োগ করবে বাংলাদেশ ও চীন সরকার। তিস্তার মাঠ পর্যায়ের জরিপে চীনের দূতাবাসের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডিরেক্টর অব পলিটিক্যাল সেকশন, জং জিং।

এই প্রতিনিধি দল বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ এবং নদীর তীরে বসবাসকারী বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে চীন সরকার দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। যদি সব কিছু পরিকল্পনা মোতাবেক এগোতে পারে, তবে জানুয়ারিতেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন চীনের কর্মকর্তারা।

‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও’ সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শাফিয়ার রহমান জানান, ২০১৪ সাল থেকে শুষ্ক মৌসুমে প্রতিবেশী দেশ ভারত তিস্তার পানি প্রায় সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বর্ষাকালে তিস্তার প্রবাহে ভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। এতে করে উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ এলাকা বার্ষিক প্লাবিত হচ্ছে, ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানুষ বাস্তুহারা হচ্ছে।

রিভারাইন পিপলসের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, তিস্তার ভাঙন এবং প্লাবনে প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এতে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানি জানান, ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকার তিস্তা বিষয়ক প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে যা তিস্তা এলাকার মানুষের স্বপ্ন পুরণের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ।

গত ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি এবং মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় টানা ৪৮ ঘণ্টার কর্মসূচি পালন করা হয়।

তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী ও বিএনপির সংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তিস্তার দুই তীরে ১৭৪ বর্গকিলোমিটার পুনরুদ্বারিত এলাকা জুড়ে গড়ে উঠবে ইকোপার্ক, শিল্পাঞ্চল, আধুনিক কৃষি ও মৎস্য খামার, কৃষিভিত্তিক কলকারখানা, এবং আধুনিক জনবসতি। এছাড়াও তিস্তা খননের ফলে ব্রহ্মপুত্র থেকে যমুনা পর্যন্ত সারা বছর নৌ-যোগাযোগ চালু থাকবে, যা অর্থনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে।

নদী বিশেষজ্ঞ ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন একটি ন্যায্য দাবি এবং এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত শহীদ আবু সাঈদের প্রথম শাহাদাৎ দিবস ও জুলাই শহীদ দিবস অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। প্রথম ৫ বছরে মূলত সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীর ভাঙন রোধ এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এছাড়া প্রকল্পের খসড়া চীন সরকারের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কাজ শুরু করা যাবে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে উত্তরাঞ্চল জীবনযাত্রার মানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, যা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা দুই কোটি মানুষের স্বপ্নের পূরণ ঘটাবে।