ঢাকা | মঙ্গলবার | ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

কেবল সাময়িক চুক্তিতে হরমুজ খুলবে না: পাকিস্তানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান

ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে রয়টার্স উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, ইরান মনে করে যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রতি আন্তরিক নয়, তাই শুধুমাত্র অস্থায়ী কোনো চুক্তির ভিত্তিতেই তারা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের অবরোধ প্রত্যাহার করবে না।

পাকিস্তান সম্প্রতি উত্তেজনা নিবারণের উদ্দেশ্যে একটি দুই ধাপের শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে। পরিকল্পনার প্রথম ধাপ অবিলম্বে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, আর দ্বিতীয় ধাপ হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছানোর আলোচনা। পাকিস্তান বলছে, তাদের প্রস্তাব ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষকে প্রদান করা হয়েছে এবং স্থানীয় মধ্যস্থতার ভূমিকায় তারা কাজ করছে। সোমবার পরিকল্পনার প্রাথমিক বিষয়গুলো চূড়ান্ত করে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা থাকলেও তা এখন অনিশ্চিত অবস্থায় আছে।

ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন তারা প্রস্তাবটি পেয়েছেন এবং তা নতুন করে পর্যালোচনা করছেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা বহিরাগত চাপের মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন না তাদের অবস্থান। প্রচলিত সংবাদে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য ওই চুক্তির শর্ত হিসেবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে না যাওয়া প্রতিশ্রুতি দিতে বলা হতো; বিনিময়ে ইরানের ওপরের কিছু আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং বিদেশে জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া হবে। তেহরান সন্দেহপ্রকাশ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য স্থায়ী সমাধান না-ও হতে পারে এবং তাই তারা সাময়িক নিশ্চয়তা ছাড়া হরমুজ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না।

বিশ্ববাজারের জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম—বিশ্বে পরিবহিত মোট কাঁচা তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই চালিকায় হয়। তাই এই নৌপথ দীর্ঘদিন অনির্দিষ্টকাল বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্বরাত্মক হুমকি ও মিলিত বার্তা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আক্রমণাত্মক ভাষায় ইরানকে হরমুজ খুলে না-দিলে ‘‘চরম বিপর্যয়ের’’ হুমকি দিয়েছেন এবং একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর কার্যকারিতাকে প্রশংসা করেছেন। এরপরও মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক কয়েকটি মধ্যস্থতাকারী দেশ ৪৫ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করছে — তবে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাক্সিওসের এই রিপোর্ট যাচাই করতে পারেনি। হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর রয়টার্সের মন্তব্য অনুরোধে তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া দেয়নি বলে জানা গেছে।

একই সময়ে যুদ্ধবিরতি ও কড়া হুমকির মিশ্র বার্তা যুদ্ধ পরিস্থিতি, সমর্থক-বিরোধী পক্ষ এবং আর্থিক বাজারকে বিভ্রান্ত করছে। সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ইরানের গভীরে গিয়ে একটি উচ্চঝুঁকির অভিযান চালিয়ে নিখোঁজ এক মার্কিন বিমানসেনাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের লক্ষ্যস্থলে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালাচ্ছে; তেহরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অবস্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

আরও উত্তেজনার কারণ, ইসরায়েল সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের একটি বড় পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় আঘাত হানে এবং দেশটির এক জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন—তারা ভবিষ্যতে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে আক্রমণের পরিকল্পনা করছে এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এই সব সরাসরি চাপ তেহরানকে আরও সতর্ক করিয়েছে এবং সমঝোতা-প্রক্রিয়াকে জটিল করেছে।

অবশেষে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে আলোচনাগুলো চলছে, সেগুলো কেবলকিছুকালীন শান্তি নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার দিকে গাইড করতে পারলে স্থানীয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতি উভয়ের জন্যই সহায়ক হবে—তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো নিশ্চিত পথরেখা চোখে পড়ছে না।