ঢাকা | বুধবার | ৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৯শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

গাজার শিশুরা এখন শুধু চামড়া আর হাড়ের মতো: চিকিৎসকের করুণ মন্তব্য

গাজা উপত্যকা, মধ্যপ্রাচ্যের একটুকরো ভূমি যেখানে শিশুর জন্ম স্বাভাবিক আনন্দের বদলে হয়ে উঠেছে দুঃখ আর সংকটের কারণ। প্রকৃতির নিয়ম মেনে শিশুর জন্মে যে পরিবারে খুশির ছোঁয়া লাগে, সেখানে গাজায় জন্মানো শিশুর বাবা-মাকে প্রথম ভাবনাটা হয়—এই শিশুটিকে কী খাওয়াব। কোনও সময়ে বোমার আঘাতে মারা যাবার ভয় যেন সাদা দিনের মতো স্পষ্ট তাদের মনেই।

গাজায় চলমান টানা যুদ্ধ বিশ্ববাসীর নজর এড়াতে পারে না, কিন্তু ইসরায়েলের মানবিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার নতুন কৌশল শিশুরা আর বাঁচতে পারছে না। খাদ্য এবং চিকিৎসা সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে যা দারুণ দুর্ভিক্ষের চিত্র তৈরি করেছে। এই সংকটের মধ্যেই শিশুরা এমন এক করুণ অবস্থায় আছে যা চিকিৎসকরাও বর্ণনা করতে ভয় পান। এক ডাক্তার জানিয়েছেন, “এখানে শিশুদের অবস্থা এতটাই খারাপ, তারা এখন শুধু চামড়া আর হাড়ের মতো হয়ে গেছে।”

বর্তমানে ইসরায়েল গাজাতে মানবিক সহায়তার প্রবেশ কঠোরভাবে সীমিত করেছে, খাদ্যের মারাত্মক ঘাটতির কারণে শত শত শিশু মৃত্যুর মুখোমুখি। নাসের হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. আহমদ আল-ফাররা জানিয়েছেন, তাঁর ওয়ার্ডে মাত্র এক সপ্তাহের শিশুখাদ্য বাকী রয়েছে। বিশেষ করে প্রি-ম্যাচিউর শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ফর্মুলা শেষ হয়ে গেছে, ফলে নবজাতকদের জন্য সাধারণ শিশুখাদ্য দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “হাসপাতালে ভর্তি শিশুর বাইরে আরও অনেকে আছেন যাদের কাছে কোনো শিশুখাদ্য নেই। এখানে ভয়াবহ পরিস্থিতি চলছে।” ইসরায়েলের সহায়তা বন্ধের কারণে গাজার শিশুখাদ্যের মজুদ দ্রুত কমছে। আমেরিকা ও ইসরায়েল সমর্থিত একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান সীমিত খাদ্য সহায়তা দিলেও সেখানে শিশুখাদ্য নেই বলে চিকিৎসকরাও জানিয়েছেন।

২৭ বছর বয়সী পাঁচ সন্তানের মা হানাআ আল-তাওয়িল গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে রয়েছেন। তিনি নিজের অপুষ্টির কারণে সন্তানদের ঠিকমতো বুকের দুধ দিতে পারছেন না, ফলে ১৩ মাস বয়সী ছেলে শিশুখাদ্য ছাড়া বাঁচছে না। তার ছেলের শারীরিক ও মানসিক বিকাশও পিছিয়ে পড়েছে। তিনি কষ্টের মধ্যে জানান, “আমার সন্তান রাতের বেলা প্রায়ই ভোরে উঠে খাবারের জন্য কাঁদে, আমি পাশে একটি টুকরা রুটি রেখে দিই।”

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ৬৬ ফিলিস্তিনি শিশু অনাহারে মারা গেছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেছে, তারা খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণের ওপর ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল দাবি করছে তারা গাজার শিশুদের জন্য খাবার ও বিশেষ ফর্মুলার প্রবেশে বাধা দিচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে তারা ১,৪০০ টনের বেশি শিশুখাদ্য পাঠিয়েছিল। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক সময় তারা ব্যক্তিগত ব্যাগে বেশি শিশুখাদ্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, যা কর্তৃপক্ষ জব্দ করে নেন।

গাজার শিশুখাদ্যের তীব্র সংকট এবং মায়েদের অপুষ্টির কারণে শিশুরা স্তন্যপান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, ফলে ফর্মুলার চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বাজারে শিশুখাদ্যের মূল্য অত্যন্ত বেশি, যেখানে এক কৌটা ফর্মুলার দাম প্রায় ৫০ ডলার, যা স্বাভাবিকের প্রায় দশগুণ।

নূরহান বারাকাত, তিন সন্তানের মা জানান, খাদ্যের অভাবে তিনি মাত্র এক মাস বুকের দুধ দিতে পেরেছিলেন তারপর তা বন্ধ করতে হয়েছে। তিনি দুঃখের সঙ্গে বলেন, “আমি জানি স্তন্যদান মা ও সন্তানের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আর আমি কী করতে পারি?”

গাজার সন্তানেরা আজ এক ভয়াবহ সংকটে মানবতার সাহায্যের অপেক্ষায় আছেন। তাদের জন্য তৎপর হওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব।