ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২০শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সন্ধান পেয়েছে কমিশন

গুম সংক্রান্ত ঘটনার তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশন তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গুমের পেছনে শুধুমাত্র দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নেই বরং বিদেশি অংশীদার এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশ গুমসহ নানা বেআইনি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, যার কারণে তারা পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবনে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিলেন।

কমিশনের মতে, গুম ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এটি ছিল সুসংগঠিত একটি কাঠামোর অংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক স্তরের পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল, বিশেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার নামে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সম্পৃক্ততা ব্যাপক ছিল।

এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, গুম বিষয়ক নিরপেক্ষ মতামত দেওয়ার কারণে তাকে সহকর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং নতুন পদায়নের আগে তার সম্পর্কে নেতিবাচক গুজব ছড়ানো হতো। তার পরিবারের ওপরও নজরদারি চলতো।

এক যুবক কমিশনকে জানান, তার ভাই একটি গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত ছিলেন এবং তাকে রাজনৈতিক বিরোধীদের তালিকা প্রস্তুত করতে বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের সকলকে হত্যা করা হয়, যা জানার পর তার ভাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

এক সৈনিক বলেন, তাকে একটি গোপন বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়েছিল যেখানে বন্দিদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করা হতো। তাকে সরাসরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বন্দিদের প্রতি নির্দয় হতে এবং বন্দিদের সামনে কথা বলাতেও নিষেধ করা হতো, ইশারা ও শিসের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলা হতো, যা অনেক ভুক্তভোগীর বর্ণনায় উঠে এসেছে।

তবে সেই সৈনিক পরবর্তীতে বন্দিদের সহায়তা করার ছোট ছোট চেষ্টা করতেন, যেমন নিজের খাবার বন্দিদের জন্য রেখে দিতেন। একজন বন্দি কমিশনকে সরাসরি জানিয়েছেন, সেই সৈনিকের দেয়া খাবারেই তিনি বেঁচে ছিলেন।

আরেক র‌্যাব গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তাকে একজন দীর্ঘদিনের বন্দিকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা অমান্য করে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন।

কমিশনের ভাষায়, ‘সবসময়ই অবাধ্যতার ফলাফল তাৎক্ষণিক হয় না। কিছু কর্মকর্তাই তাদের অবস্থান বলে টিকে ছিলেন।’ উদাহরণস্বরূপ, দুই র‌্যাব সদস্য র‌্যাব গোয়েন্দা প্রধানকে হাতে লেখা চিঠি দিয়ে জানান যে তারা বেআইনি আদেশ পালন করবেন না।

এক চিঠিতে লেখা ছিল, ‘যদি কোনো অভিযান আইন বিরোধী হয় বা বেআইনি গুলি চালানোর উদ্দেশ্যে হয়, আমি তাতে অংশ নিতে পারব না।’

প্রতিবেদন জানায়, এসব নোটসমূহ কয়েকটি যখন বিগত সরকারের পতনের আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো হয়েছিল, পরে সেগুলো গণভবন থেকে উদ্ধার করা হয়।

তবু, কমিশন জানিয়েছে, এরপরও গুমের মত ভয়াবহ অপরাধ ঘটে চলেছে, যেখানে লাশ ট্রেনলাইন অথবা চলন্ত যানবাহনের নিচে ফেলে গুম করা হয়।

প্রতিবেদন জানায়, ‘গুমের মত অপরাধগুলি অনেক পরিমাণে নীরবে অনুমোদিত ছিল এবং যারা এ ধরনের কাজ সম্পাদন করেছিল তারা প্রকৃত অপরাধী হিসেবে সম্মানিত হয়নি।’

কমিশনের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভারত ছাড়াও, আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে পশ্চিমা সহযোগিতার সুবিধা লাভ করেছিল।

এক ভুক্তভোগী কমিশনকে বলেন, তাকে ডিবির হেফাজতে দুজন আমেরিকান নাগরিক জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তারা সরাসরি নির্যাতনে অংশ না নিলেও তাদের উপস্থিতি ওই বেআইনি আটক কার্যক্রমকে বৈধতাপ্রদান করেছে।