ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২০শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

গুমের শিকারদের চারটি সম্ভাব্য পরিণতি: গুম তদন্ত কমিটির সভাপতি স্মরণ করালেন

গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই গুম ঘটানো হত। গুমের শিকার ব্যক্তিদের সম্মুখীন হতে হয়েছে চার ধরনের পরিণতিতে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান তিনি। কমিটিতে দাখিল করা অভিযোগের বিশ্লেষণ থেকে এসব বিস্তারিত জানা গেছে।

তিনি জানান, গুমের শিকার ব্যক্তিদের সম্ভাব্য পরিণতি হলো: প্রথমত, তাদের হত্যা করা; দ্বিতীয়ত, বিচার অনুষ্ঠানের আগে মিডিয়ার সামনে তুলে এনে জঙ্গি তকমা দিয়ে দেশে গ্রেফতার দেখানো; তৃতীয়ত, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাঠিয়ে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে গ্রেপ্তার করানো; এবং চতুর্থত, ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে মামলাবিহীন মুক্তি পাওয়া।

গুম সংক্রান্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন গত ৪ জুন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়ার পরে আজ দুপুরে গুলশানে কমিশন অফিসে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এসব তথ্য প্রকাশ করেন।

তিনি আরো বলেন, কোনও দমননীতির অংশ হিসেবে বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ভিন্নমতের মানুষদের বিরুদ্ধে গুমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরেও অনেক অপরাধী ও তাদের অনুকরণকারীরা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকায় প্রমাণ ধ্বংস ও অসহযোগিতা চালিয়ে আসছে। ফলে তদন্তে নানা বাধার সৃষ্টি হয়েছে। তবুও বহু ভুক্তভোগী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তাদের কাহিনি তুলে ধরেছেন।

বিচারপতি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের শাসনামলে গুম একটি প্রাতিষ্ঠানিক এবং সুসংগঠিত ‘জঙ্গিবাদবিরোধী’ সত্তার ছায়ায় রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের এবং শাসন দীর্ঘায়িত করার একটি অপকৌশল হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ছিলেন মেধাবী ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষ।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা গুমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা হয়নি এবং গোপন আটক ও নির্যাতনের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু ছিল। এমনকি অনেক নাগরিককে বেআইনিভাবে বারবার ভারতীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

কমিশনের কাছে দাখিলকৃত ১৩১টি অভিযোগের তদন্ত ও ভিকটিমদের উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য পুলিশ মহাপরিদর্শককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গোপন আটক কেন্দ্রের অস্তিত্ব আর অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। অধিকাংশ ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা একই ধরনের পদ্ধতিগত নির্যাতন ও সন্ত্রাসী প্রচারের আওতায় পড়েছে যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে।

তিনি জানান, প্রতিবেদনে ১৯ শতাংশ ফেরত না আসা ১২ জন ভিকটিমের বিষয়ে অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে, যাদের গুমের জন্য দেশী-বিদেশী কারা দায়ী তা প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু চলমান অনুসন্ধানের স্বার্থে এর বেশি তথ্য প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

তথ্য সীমিততা ও নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কমিশন অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদন সন্ত্রাসবিরোধী মামলাগুলোতে অপব্যবহার রোধে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করতে এবং আইনের শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত কৌশল প্রণয়নের সুপারিশ করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে গুম সংক্রান্ত কমিশনের অন্যান্য সদস্যরা যেমন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত বিচারক মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, মানবাধিকার কর্মী নূর খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাবিলা ইদ্রিস এবং মানবাধিকার কর্মী সাজ্জাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।