ঢাকা | শুক্রবার | ২২শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৫ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

গ্রিড সীমাবদ্ধতা বাধা দিচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবুজ অগ্রগতিকে

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবুজ শিল্পপার্ক, ডেটা সেন্টার ও ইভির দ্রুত বিস্তার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও আকাশচুম্বী হয়ে উঠছে। বেইন অ্যান্ড কোম্পানি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের যৌথ রিপোর্ট ‘দক্ষিণ এশিয়ার সবুজ অর্থনীতি ২০২৬’ অনুযায়ী, আগামী তিন-চার বছরে এসব খাতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ টেরাওয়াট ঘণ্টারও বেশি হতে পারে — যা অঞ্চলের দ্রুত শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির তিব্র বিকাশের প্রতিচ্ছবি বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই বর্ধিত চাহিদা মেটাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্যুৎ খাতে ২০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ দরকার হবে (প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার), যার অর্ধেকেরও বেশি লাগবে কেবল ডেটা সেন্টারগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে। বর্তমানে অঞ্চলটির সবুজ অর্থনীতির বাজারমূল্য প্রায় ২৯ হাজার কোটি ডলার (প্রায় ২৯০ বিলিয়ন ডলার) — রিপোর্ট বলছে, চার বছরের মধ্যে এটি ৪৩ হাজার কোটি ডলারে (প্রায় ৪৩০ বিলিয়ন ডলার) পৌঁছাতে পারে। দীর্ঘসূত্রী গ্রিড সংযোগ এড়াতে অনেক ডেটা সেন্টার অপারেটর এখন বাড়তি মূল্য বা প্রিমিয়াম দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

বিদ্যুৎ ও ইভি খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি ও বিদেশি কোম্পানি প্রায় ৫৪ হাজার কোটি ডলারের (প্রায় ৫৪০ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগের ঘোষণা দিলেও, তা বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। রিপোর্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে গৃহীত প্রকল্পগুলোর মাত্র সাড়ে ছয় শতাংশ নয়—প্রায় ৬০ শতাংশই সঠিকভাবে বাস্তবায়নের পথে রয়েছে; বাকি অংশ নানা কারণে স্থগিত বা অনিশ্চিত। মূলত স্পষ্ট নীতিমালার অভাব, অনুমোদন জটিলতা এবং কাজের ধীরগতি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করছে।

এ অঞ্চলের সবুজ রূপান্তরের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে গ্রিড বা সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতা। গত পাঁচ বছরে সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৫০–৬০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। অস্পষ্ট বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, সরকারি অনুমোদনের জটিল প্রক্রিয়া এবং কড়াকড়ি গ্রিড সংযোগ নীতি এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের (প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ ঘাটতি থাকতে পারে, যা রূপান্তর প্রক্রিয়াকে বিরতিতে ফেলবে।

রিপোর্টে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে অনেক দেশের অগ্রাধিকার এখন পরিবেশ রক্ষার চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে ঝুঁকেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো গ্রিড আধুনিকীকরণ ও নীতিগত সংস্কারে তৎপরতা না বাড়ায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সঙ্কট ও জ্বালানি নিরাপত্তার সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশ্লেষকরা সুপারিশ করছেন—সরকারি নীতিতে স্বচ্ছতা ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, গ্রিড ইনফ্রা আপগ্রেডে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতা শক্ত করা, এবং রিজিওনাল প্ল্যানিং ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের বোঝা সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। এগুলো না হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবুজ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।