কয়েক দফা পেছানোর পর একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদন মিলেছে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের জন্য। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসাবে সরকারের এই পদক্ষেপকে বড় একটি প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ের জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩,৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ের মন্ত্রিসভার কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পটি জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ সময়সীমায় বাস্তবায়িত হবে।
একনেক এদিন মোট ৩৬,৬৯৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার ব্যয়ের ৯টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৬,৪৯০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২০৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, কৃষি মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং অন্যান্য উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা।
অনুমোদিত ৯টি প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো:
– সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন (২য় সংশোধন) এবং গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ (২য় সংশোধন)।
– স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জেলা শহরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যার কেন্দ্র হিসেবে পুনর্নির্মাণ (প্রথম ফেজ)।
– তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের হাই-টেক সিটি-২-এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ (৩য় সংশোধন)।
– সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি শিশু পরিবার ও ছোটমণি নিবাস নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ (২য় সংশোধন)।
– প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসনের জন্য এসএম ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ।
– গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড (পতেঙ্গা থেকে সাগরিকা) (৫ম সংশোধন)।
– পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পদ্মা ব্যারেজ (১ম পর্যায়) প্রকল্প।
– বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ময়মনসিংহ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য ধনুয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ (১ম সংশোধন)।
একনেকে পরিকল্পনা মন্ত্রী দুইটি ছোট ব্যয়সংবলিত প্রকল্প (৫০ কোটি টাকার কম) সম্পর্কেও অবহিত করেন—ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিমানবাহিনী ঘাঁটি কুর্মিটোলায় বিমানসেনা ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প।
পদ্মা ব্যারেজ (১ম পর্যায়) — প্রকল্পের মূল কনসেপ্ট ও সুবিধাসমূহ:
প্রকল্পটি রাজবাড়ীর পাংশা পয়েন্টে ২.১ কিমি দীর্ঘ একটি ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা করে। ২.১ কিমি দীর্ঘ এই ব্যারেজে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ের গেট (প্রতিটি ১৮ মিটার প্রশস্ত) এবং ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট। ব্যারেজের ওপর দিয়ে একটি রেলওয়ে সেতু নির্মাণ করা হবে এবং বাঁধের ডেককে সড়ক সংযোগ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার সুবিধা রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যারেজ ও গড়াই অফটেক স্ট্রাকচারে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিনা জ্বালানিতে উৎপন্ন হবে। প্রকল্পটির মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী—এই পাঁচটি নদী সিস্টেম পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গড়াই-মধুমতী নদী সিস্টেমে ১৩৫.৬০ কিমি এবং হিসনা নদী সিস্টেমে ২৪৬.৪৬ কিমি নিষ্কাশন পুনঃখনন (ড্রেজিং) করা হবে এবং প্রস্তাবনায় ১৮০ কিমি এফ্ল্যাক্স বাঁধ নির্মাণের কথা বলা রয়েছে।
প্রকল্পের আঞ্চলিক প্রভাব ও উপকারভোগী:
সরকারের হিসাব অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। এটি চারটি বিভাগের ২৬ জেলা ও ১৬৩টি উপজেলাকে প্রভাবিত করবে; প্রথম পর্যায়ে ১৯ জেলা ও ১২০ উপজেলা সরাসরি সুফল পাবে। সরাসরি উপকারভোগী জেলা হিসেবে নাম আছে—
– খুলনা বিভাগ: কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা।
– ঢাকা বিভাগ: রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ।
– রাজশাহী বিভাগ: পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
– বরিশাল বিভাগ: পিরোজপুর।
প্রত্যাশিত সুফল:
– লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ: শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানি সংরক্ষণ নিশ্চিত করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা কমানো যাবে।
– কৃষি ও মৎস্য উন্নয়ন: প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে; এতে বার্ষিক ধান উৎপাদনে প্রায় ২৩.৯০ লাখ টন এবং মাছ উৎপাদনে প্রায় ২.৩৪ লাখ টনের অতিরিক্ত বৃদ্ধি আশা করা হচ্ছে।
– সুন্দরবন রক্ষা: মিষ্টি পানির সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে।
– অর্থনৈতিক ফলাফল: প্রকল্পটির অভ্যন্তরীণ আর্থ-সামাজিক রিটার্ন হার (EIRR) ধরা হয়েছে ১৭.০৫%, যার মাধ্যমে বার্ষিক প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আশা করা হচ্ছে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ:
প্রকল্পের সম্পূর্ণায়নে মোট প্রয়োজন ৫০,৪৪৩ কোটি টাকা হওয়ায় অর্থায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার স্বার্থে এটিকে দুই পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে; প্রথম ধাপে ৩৩,৪৭৪ কোটি টাকায় মূল ব্যারেজ ও গুরুত্বপূর্ণ নদী সিস্টেমের কাজ শেষ করার লক্ষ্য। তবু বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা—১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন যে ব্যারেজের উজানে ক্ষয় ও ভাটিতে পলি জমার মতো পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য উন্নত নকশা এবং নিয়মিত হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল সমীক্ষার প্রয়োজন হবে।
সরকারি কর্মকর্তারা মনে করেন, এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও যদি প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বেশ কিছু ‘মৃতপ্রায়’ নদী আবার প্রাণ ফিরে পাবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকটাই সুরক্ষিত হবে।








