গত সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার পরীক্ষণ থিয়েটর হলে নাটকের দল দৃশ্যকাব্যের নতুন প্রযোজনা ‘ইডিপাস’ মঞ্চস্থ হয়। বিশ্বকবির কালের পরিক্রমায় আজও প্রাসঙ্গিক থাকা সফোক্লিস রচিত ‘ইডিপাস রেক্স’ অবলম্বনে সাজানো এই постановনা দর্শকদের সামনে মানবচেতনা, ভাগ্য ও নৈতিকতার গভীর প্রশ্নগুলো উন্মোচন করে। নাটকের বাংলা অনুবাদ করেছেন প্রয়াত সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আহসান, নির্দেশনা দিয়েছেন হাবিব মাসুদ।
শাশ্বত ট্র্যাজেডির রূপে রচিত এই প্রযোজনায় মানুষের আত্ম-অনুসন্ধান ও অনিবার্য পরিণতির যে তীব্র যন্ত্রণা, তা নিবিড় শৈল্পিক ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কাহিনীর ধাঁচে দেখা যায় কীভাবে প্রধান চরিত্র ইডিপাস নিজের অজান্তেই নিয়তির চক্রে আটকে পড়ে এবং ক্রমে নিজেকেই এক করুণ সত্যের মুখোমুখি পায়। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, নৈতিকতার সংকট ও আত্ম-চেতনার ভাঙন—এসব উপাদান নাটকের প্রতিটি অধ্যায়ে উপস্থিত দর্শকদের মনের ভেতরে দীর্ঘসময়ের জন্য প্রশ্ন জাগায়।
নির্দেশক হাবিব মাসুদ বলেন, আধুনিক সমাজে যে নেতৃত্বহীনতা ও শূন্যতার ছাপ দেখা যায়, সেটাই এই প্রযোজনার মূল অনুপ্রেরণা। তিনি যোগ করেন, ‘ইডিপাস’ মূলত এমন এক জনপদের গল্প যারা অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ভেসে বেড়ায়; নিয়তির বিরুদ্ধে আর্তনাদই ট্র্যাজিক হিরোকে মহান করে তোলে, তবু শেষ পর্যন্ত সে নিয়তির কাছে পরাজিত হয়। এই অনিবার্য পরাজয় ও লড়াকু মানসিকতার সংমিশ্রণ বর্তমান সময়ের মানুষের জীবনবোধের সঙ্গে কৌতুকহীন সামঞ্জস্য রেখে যায়।
প্রযোজনায় অভিনয় করেছেন একঝাঁক প্রতিভাবান শিল্পী যারা তাদের বলিষ্ঠ অভিনয় দিয়ে নাটকটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। কেন্দ্রীয় ও পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন এইচ এম মোতালেব, ঝুমু মজুমদার, আহাদ বিন মুর্তজা, নাইমুল ইসলাম সিয়াম, মো. মুন্না মোল্লা, আশিকুল ইসলাম, রিমন সাহা ও উৎপল চন্দ্র বর্মন। এছাড়াও কান্তা কামরুন, ওমর ফারুক খান ফাহিম, পায়েল আহমেদ, আফরোজা বিথী, মো. রিয়াজুল করিম রিয়াজ, রিয়া হোসেন ও হীরালাল দাসের বিদগ্ধ অভিনয় নাটকের আবহকে শক্তপোক্ত করেছে।
দৃশ্যাবলী, আলোকসজ্জা ও শব্দচিত্র একসঙ্গে মিলে দর্শকদের প্রাচীন থিবি নগরের রাজপ্রাসাদের ঐতিহাসিক আবহে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে নিয়তী ও মুক্তির প্রশ্ন দুটোই আবির্ভূত হয়। সার্বিকভাবে ‘ইডিপাস’ প্রযোজনাটি কেবল পুরাতন কাহিনি পুনরাবৃত্তি নয়, বরং বর্তমান সময়ের সামাজিক-মানসিক বাস্তবতার সঙ্গে সংলাপ রচনা করে এমন এক মঞ্চানুভব উপহার দেয়। দর্শকরা নাটক থেকে বেরিয়ে আসার পর দীর্ঘক্ষণ তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হন—এটাই সম্ভবত প্রযোজনার বড় সফলতা।








