ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৩রা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

নওগাঁর আমবাগানে সোনালি আশা, কিন্তু দাম না পেয়ে হতাশা

নওগাঁয়ের আম মৌসুম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ২ মে থেকে। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে গুটি, নাগ ফজলি, হিমসাগর, আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগোসহ বহুবিধ জাতের রসে-ভরে ওঠা আম উঠতে শুরু করলে চাহিদা বাড়ার প্রত্যাশাও জাগে। খেতে-হাটে আম ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্য থাকলেও, মৌসুমের শুরুর এই পর্যায়ে বাজার কিছুটা স্থবির থাকার ফলে অনেক চাষি এখনই আশানুরূপ দাম পাচ্ছেন না বলে হতাশা প্রকাশ করছেন।

জেলা জুড়ে আমের বাগান, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে গত বছরের মতো চঞ্চলতা ফিরে এসেছে। তবু উৎপাদনমূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ও প্যাকেজিং খরচের চাপ এবং দামের ওঠানামা নিয়ে শঙ্কা ছড়িয়েছে। অনেকে মনে করেন রপ্তানি বাড়ানো এবং আমপ্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুললে নওগাঁর চাষিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং আমবাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ক্রেতারা নওগাঁর মোকামগুলোতে আসতে শুরু করলে চাহিদা বাড়বে ও দাম ওঠার সম্ভাবনা আছে।

সরেজমিন ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে নওগাঁ জেলায় আমের আবাদ ছিল মাত্র ৬,২৬৮ হেক্টর। এক দশকের মধ্যে সেই আয়তন বেড়ে বর্তমানে ৩০,৩১০ হেক্টরে পৌঁছেছে। এ মৌসুমে জেলার বাগানগুলো থেকে প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।

রপ্তানাযোগ্য মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জেলার ১৮৬ হেক্টর জমিতে আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগো ও গৌড়মতি জাতের প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ ৫১ হাজার ৫০০টি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়েছে। গত বছর সাপাহার ও পোরশা উপজেলা থেকে বিভিন্ন রপ্তানিকারকের মাধ্যমে ২৮৪ টন আম্রপালি, খিরসাপাত ও ব্যানানা ম্যাংগো মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রফতানি হয়েছিল।

চাষিদের খরচের দিকটিও উদ্বেগজনক। তাদের কথায়, এক বিঘা মাঝারি আয়তনের বাগান থেকে সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ মন আম পাওয়া যায়। বর্তমানে জমির ইজারা, সার, কীটনাশক, শ্রমিক, পরিবহন ও প্যাকেজিংসহ খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিকেজি আম মোকামে পৌঁছে গড়ে প্রায় ৩২–৩৪ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এই হিসাব অনুযায়ী প্রতি মন আম যদি ১,৫০০ টাকার নিচে বিক্রি হয়, অনেক ক্ষেত্রেই চাষিরা লোকসানের মুখে পড়বেন।

নওগাঁর সাপাহার হাটে চলতি মৌসুমে দামপ্রকাশ অনুযায়ী হিমসাগর প্রতি মন ৯০০–১,০০০ টাকা, নাগ ফজলি ১,২০০–১,৫০০ টাকা, গুটি আম ১,২০০ টাকা, আম্রপালি ১,০০০–২,০০০ টাকা এবং ল্যাংড়া প্রায় ১,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই বাজারদরে অধিকাংশ চাষিই তাদের প্রত্যাশিত মুনাফা পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন।

সাপাহারের পাকুড়ডাঙ্গা গ্রামের আমচাষি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে আম্রপালির বাগান করেছি। প্রতি বিঘায় সার, সেচ, কীটনাশক, শ্রমিক ও পরিচর্যায় প্রায় ৭০–৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি বিঘা থেকে ৫০–৬০ মন আম পাওয়ার আশা করছি। বর্তমান দরে বিক্রি করলে বিঘাপ্রতি ৫০–৬০ হাজার টাকার মতো লাভ পাওয়া সম্ভব হবে।’

সরদারপাড়া এলাকার চাষি আনিছুর রহমান বলেন, ‘এ বছর গাছে আমের পরিমাণ তুলনামূলক কম। গত বছর মৌসুমের শুরুতে আম্রপালি কদাচিৎ ১,৫০০ থেকে ৩,৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, কিন্তু এ বছর দাম কিছুটা নামেছে। যদি দাম ৩,০০০ টাকার নিচে বেঁকে যায় তাহলে উৎপাদন খরচ তুলতে কষ্ট হবে।’

বদলগাছী উপজেলার আমচাষি মোস্তাকিম জানান, ‘তিন বিঘা জমিতে নাগ ফজলি চাষ করেছি। প্রতি বিঘায় ৬০–৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ৪০–৫০ মন আম পাওয়ার আশায় আছি। বর্তমানে বাজারে খুব বেশি লাভ নেই, তবে মৌসুমের শেষে দাম বাড়লে কিছুটা সুবিধা মিলবে। রপ্তানি বাড়লে চাষিরা আরও লাভবান হবেন।’

সাপাহার উপজেলা আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেন, ‘সাপাহারের আমের হাটে প্রতি মৌসুমে প্রায় ৬–৭ হাজার কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়। কিন্তু সার, কীটনাশক, জমির ইজারা, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাষিরা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাচ্ছেন না। তাদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।’

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল বলেন, ‘আমের রপ্তানি বৃদ্ধি ও আমভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা গেলে কৃষকরা আরও বেশি উপকৃত হবেন। বর্তমানে সীমিত পরিসরে কিছু রপ্তানিকারক সরাসরি বাগানিদের সঙ্গে কাজ করছেন। ফ্রুট ব্যাগিং করা আম বিদেশি বাজারে বেশি গ্রহণযোগ্য হওয়ায় সেসব আমের দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। উত্তম কৃষি চর্চার দিকে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।’

চাষিরা ও ব্যবসায়ীরা আশাবাদী যে, পাইকারি ক্রেতারা নওগাঁর মোকামে আসা শুরু করলে বাজারে চাহিদা বাড়বে এবং দাম স্থিতিশীল হবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে রপ্তানি লেনদেন বাড়ানো, মানসম্মত প্যাকেজিং ও স্থানীয় প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর সবাই জোর দিচ্ছেন। ফলে এখন প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা, ভর্তুকি বা সহায়তা এবং কৃষি সম্প্রসারণ ও বাজার ব্যবস্থাকে শক্ত করা, যাতে চাষিরা তাদের ‘সোনালি স্বপ্ন’ বাস্তবে রূপ দিতে পারেন।