যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এটি চাঁদের পৃষ্ঠে মানুষের স্থায়ী বসতি গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আমেরিকার প্রধান মহাকাশ সংস্থার সাময়িক প্রধান শন ডাফি জানান, এই প্রকল্প ভবিষ্যতের চন্দ্র অর্থনীতি, মঙ্গলে উচ্চ ক্ষমতার শক্তি উৎপাদন এবং মহাকাশে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য অপরিহার্য। তিনি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কমপক্ষে ১০০ কিলোওয়াট শক্তি উৎপাদনে সক্ষম পারমাণবিক চুল্লির ডিজাইন প্রদানে আহ্বান জানিয়েছেন। এই চুল্লিগুলো হবে তুলনামূলকভাবে ছোট, যা চাঁদের শক্তি চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে।
এর আগে ২০২২ সালে নাসা তিনটি কোম্পানিকে ৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি দিয়েছিল পারমাণবিক চুল্লির ডিজাইনের জন্য। অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়া ২০৩৫ সালের মধ্যে চাঁদে একটি স্বয়ংক্রিয় পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন শক্তি সরবরাহের জন্য পারমাণবিক চুল্লি অপরিহার্য। চাঁদের দিন পৃথিবীর থেকে দীর্ঘ হওয়ায়, প্রায় দুই সপ্তাহ রৌদ্রোজ্জ্বল থাকলেও পরবর্তী দুই সপ্তাহ অন্ধকারের কারণ সৌরশক্তির ওপর নির্ভরতা অসুবিধাজনক।
বিশ্ববিদ্যালয় অব সারের মহাকাশ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র লেকচারার ড. সঙ্গউ লিম বলেন, “চাঁদে স্থায়ী বসতি গড়ার জন্য মেগাওয়াট-স্তরের শক্তি দরকার, যা শুধুমাত্র পারমাণবিক শক্তির মাধ্যমে সম্ভব।” অন্যদিকে, ল্যাংকাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিওনেল উইলসন মনে করেন, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পেলে ২০৩০ সালের মধ্যে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব।
তবে এই পদক্ষেপগুলো নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রশ্ন উঠেছে। ওপেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. সিমিপন বারবের জানান, পারমাণবিক পদার্থ উৎক্ষেপণের সময় বিশেষ অনুমোদন প্রয়োজন এবং নিরাপত্তাসূচক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সম্প্রতি নাসার বাজেটে ২৪ শতাংশ হ্রাসের মধ্যেও এ প্রকল্পের ত্বরান্বিত হওয়া কিছুটা অবাক করার মতো। অনেকেই ভাবছেন, এসব পরিকল্পনা সত্যিকার বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি না হয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হতে পারে।
চীন ও রাশিয়ার সম্ভাব্য “কিপ-আউট জোন” ঘোষণার প্রেক্ষিতে শন ডাফি বলেন, আন্তর্জাতিক ‘আর্টেমিস’ চুক্তির মাধ্যমে দেশগুলো নির্বিঘ্নে চাঁদে কাজ করবে। এই চুক্তিতে ‘সেফটি জোন’ বানানোর স্থান রয়েছে, যা পারমাণবিক চুল্লি বা অন্য কোনো ভিত্তির নিরাপত্তা বজায় রাখতেও সাহায্য করবে।
ড. বারবের আরও উল্লেখ করেন, “চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের জন্য অনেক প্রযুক্তিগত, নিরাপত্তাসংক্রান্ত ও অর্থনৈতিক বাধা কাটিয়ে উঠতে হবে। শক্তি থাকলেই যথেষ্ট নয়, সরঞ্জাম ও মানুষ বাহিত করা না পারলে লাভ হবে না।”
নাসার আর্টেমিস ৩ মিশনের লক্ষ্য ২০২৭ সালে চাঁদে মানুষ পাঠানো, যা সফল হলে আগামী দশকে চাঁদে স্থায়ী বসতির স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে। তবে তহবিল এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এখনও বৃহৎ। পরিপ্রেক্ষিতে, চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন প্রকল্প মহাকাশ অন্বেষণের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।








