ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৩ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

পেঁয়াজ আমদানির জন্য সতর্কতা এবং বাজার পরিস্থিতি

সম্প্রতি পেঁয়াজের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেশজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে বাজারে অস্থিরতা চলমান থাকায় কেজিতে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে এখন ১১০ টাকার বেশি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, মধ্যস্বত্বভোগীরা কারসাজি করে দাম বাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। এর কারণে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) আমদানির পক্ষে সুপারিশ করতে বাধ্য হয়েছেন, যাতে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি করে দাম নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।জনপ্রিয় উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এই পর্যায়ে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিলে পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি হবে। তবে তিনি মনে করেন, এখনই আমদানির অনুমতি না দিলেও ক্ষতি হবে না, কারণ দেশে যথেষ্ট পরিমাণ পেঁয়াজ মজুত আছে এবং নতুন পেঁয়াজ আসার প্রক্রিয়া underway। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই; চলতি মাসে অন্তত ৭৫,০০০ টন দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসছে। কিছু আমদানিকারক আমদানির অনুমতি না পেয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তবে farmers এর ক্ষতি হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। এতে করে উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।অপরদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ জমা রয়েছে, এবং জেলা পর্যায়ে সচ্ছলভাবে সরবরাহ চলমান। এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিংয়ে শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, দেশের পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকার হাই ফ্লো মেশিন সরবরাহ করেছে যাতে সংরক্ষণের সমস্যা না হয়। ভবিষ্যতে আরও নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে যাচ্ছে, ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে তারা আমদানির অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি আরও বলেছিলেন, বর্তমানে দুই হাজার ৮০০ আবেদনপত্রে মাত্র ১০ শতাংশ অনুমোদন দিলে বাজারে সয়লাব হয়ে যাবে, যা ক্ষতির কারণ হবে। ফলে পুরো পরিস্থিতি নজরে রেখে আসল পরিস্থিতি সামঞ্জস্য রাখতে তারা সতর্ক।পণ্য সরবরাহের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, বাজারে পেঁয়াজের সংকট মূলত মজুতদার বা সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন এই অস্থিরতা দ্রুত কাটিয়ে যাবে। তিনি বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বা মজুতের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।বিটিটিসির প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, পেঁয়াজের দাম জ্যোতিষ্কের মতো হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া কারণে ক্রেতারা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। সরবরাহ ও বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকতে এই সংস্থা আমদানির পক্ষে সুপারিশ করে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি লাভ না করে ভোক্তারা যৌক্তিক মূল্যে পেঁয়াজ কিনতে পারে। গত মার্চে গড়ে কেজিপ্রতি পেঁয়াজের মূল্য ছিল ৩৩ টাকা, আর নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৫ টাকা। এর মানে মার্চের তুলনায় দাম শতকরা আড়াই গুণ বেশি। একই সময়ের মধ্যে এপ্রিলের গড় মূল্য ৬৩ টাকা থেকে নভেম্বরে বেড়ে ১৩০ টাকা হয়েছে। দেখা যায়, নভেম্বরের দাম মার্চ-এপ্রিলের তুলনায় ১০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, গত দুই-তিন মাসে দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও, গত এক সপ্তাহে দাম ৩৭ থেকে ৪২ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা অস্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অক্টোবর-ডিসেম্বরে সাধারণত পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই বৃদ্ধি অতিরিক্ত হওয়ায় বাজারের অস্থিরতা স্পষ্ট। এ অবস্থায়, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে তুলনা করে দেখা গেছে, ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম বর্তমানে কেজিতে মাত্র ১৬ টাকা, এ পরিস্থিতিতে আমরা যদি ১০ শতাংশ শুল্ককরে আমদানির অনুমোদন দিই, তাহলে দেশে কেজিপ্রতি ৫০ টাকার কম দামে বিক্রি সম্ভব।বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে মূলত ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হয়। এছাড়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, মিয়ানমার, চীন ও মিশর থেকেও পণ্য আসে। গত বছর মোট চার লাখ ৮৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অক্টোবর পর্যন্ত দেশে দেশের পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও, এখন এর প্রাধান্য কমে গেছে। ফলে দাম বেড়েছে। যা মূলত বছরভর পেঁয়াজের আমদানির সীমিততার ফলে একচেটিয়া পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, যদি দ্রুত পেঁয়াজের আমদানি শুরু হয়, তবে দাম দ্রুত কমে যাবে। তারা বলেন, বর্তমানে পেঁয়াজের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক থাকলেও, আমদানি বাড়ালে দাম আরও কমানো সম্ভব। এখনই দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি, যাতে বাজার স্বাভাবিক হয় এবং কৃষকদের ক্ষতি না হয়।