বাংলাদেশকে একটি সবুজ ও পরিবেশবান্ধব দেশের রূপে গড়ে তুলতে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বৃক্ষের মাধ্যমে আমরা স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও সুন্দর বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারব। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই ধরনের আয়োজন শুধুমাত্র একটি বার্ষিক উৎসব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার বিনিয়োগ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, দেশের সকল প্রাণীর জন্য নিরাপদ বাসস্থান তৈরি করতে হলে আমাদের আরও বেশি সচেতন ও উদ্যোগী হতে হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী কেন্দ্রস্থলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্ব পরিবেশ দিবস, বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল— ‘‘বৃক্ষ রোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’’।
প্রসঙ্গত, এই অনুষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ জাতীয় পুরস্কার ২০২৫ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর হাতে পুরস্কার ও লভ্যাংশের চেক তুলে দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী সবাইকে একেকটি গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমরা যতই সবুজের গুরুত্ব বোঝি না কেন, আজকের দুনিয়ায় তার জন্য আরও পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবারে নতুন সন্তানের জন্ম হলে বা কোনো স্বজনের কাছ থেকে শুভ সংবাদ পেলেই যেন আমরা একটি গাছ রোপণ করি, এটা একটা সুন্দর সামাজিক আন্দোলন হতে পারে।
তিনি বলেন, নবজাতকের জীবনী উদযাপন করতে করতে আমরা একটি গাছের কথাও স্মরণ করি, তাহলে সেই আন্দোলন সফল হবে। সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে যেমন, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম’ চালু, স্কুলগুলোতে খুব বড় পরিসরে গাছ লাগানো, ক্লাইমেট ইউথ ফেলোশিপ ও এনভায়রনমেন্ট স্টার্ট-আপ ফান্ড এর মতো প্রকল্প। এসব কার্যক্রমের সফলতা বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য বড়ই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করেন, পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় ২৫ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে, গাছের প্রজাতি ও জীবনচক্র অনুযায়ী সঠিক জায়গায় সঠিক গাছ লাগানো অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, বৃক্ষের যত্ন নেওয়া ও রোপণের পরে তার যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। গাছ, প্রাণী, মাটি, জল ও বায়ুর সুস্থতা ধরে রাখতে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে ‘মাদার ট্রি’ হিসেবে পরিচিত বড় বা প্রাচীন গাছগুলো রক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বন উজাড়, পাহাড় কাটা, মারাত্মক বনভূমি ধ্বংস ও বন্যপ্রাণী হত্যা ঠেকাতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মানুষকে সচেতন করে এসব প্রথাগত অজুহাত থেকে বেরিয়ে আসার জন্যও তিনি আহ্বান জানান।
নদীগুলো রক্ষা করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, নদী ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তাই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করা অপরিহার্য। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান সরকারের পরিকল্পনায় ছাদবাগান, নগর বনায়ন, জিআইএস ভিত্তিক বৃক্ষরোপণ, নদী ও খালের পাশে সবুজায়ন এবং ইকোট্যুরিজমকেও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদী ভাঙনসহ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করতে হলে পরিবেশের মূল ভাবনা ও জাতীয় উন্নয়নের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন, জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই বাংলাদেশ বাস্তবায়ন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিশেষ নজরদারি ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি, সারাদেশে নদী ও খাল খননের পরিকল্পনা শুরু হয়েছে, যা কৃষকদের সেচ সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কমাতে কাজ করবে।
শহর ও বন্দরগুলোতেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তনের প্রয়োজন। প্লাস্টিকের বর্জ্য কমাতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে যেমন, জৈব সার উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের কার্যক্রম। একইসঙ্গে, সচেতনতার মাধ্যমে নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, অপ্রযোজ্য নগরায়ণ, নদী ও জলাভূমি ভরাট এবং বন উজাড়ের কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। এসব কারণে জলজ জীব ও বনভূমির বাসস্থান সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। তাকে রক্ষা করতে হলে সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
অবশেষে, তিনি বাংলাদেশ পর্যায়ে সফলভাবে বন ও পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষরোপণে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ এবং পরিবেশসচিব ফাহমিদা খানমসহ অনেকে।








