দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শুরু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচি ‘মিড-ডে মিল’ আজ গুরুতর প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের সুস্বাস্থ্য, ক্লাসে মনোযোগ বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ আগের চেয়ে আরও বৃদ্ধি করা, কিন্তু এখন তা নানা অনিয়মের খাতিরে সংকটে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ এবং অর্থের অপচয়সহ বিভিন্ন অভিযোগের কারণে এই প্রকল্পটির গ্রহণযোগ্যতা চরমভাবেteesপতেছে। দৈনিক বাংলার বিশেষ প্রতিবেদনটিতে এই মহামারী প্রতিরোধের জন্য অসাধু ঠিকাদার, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা বিভাগে গাফিলতির মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েকজন অসাধু ঠিকাদারদের কাছে থেকে দুর্বল মানের খাবার সরবরাহের কারণে এই উদ্যোগের মূল বার্তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিদ্যালয় পর্যায়ে খাবার সরবরাহে মানসম্পন্নতার অভাব দেখা দিয়েছে, যেখানে পচা ডিম, শক্ত ও নিম্নমানের রুটি এবং অপরिच্ছন্ন খাদ্য সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। পুষ্টির মান না থাকা, খাবারে অখাদ্য বস্তু এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বিরাজমান। এছাড়া বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষা বিভাগের গাফিলতি এবং দুর্নীতির কারণে এই প্রকল্পের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে, ১৫০ উপজেলায় এই কর্মসূচি কার্যকরী থাকলেও এর তিন বছরের মোট ব্যয় আনুমানিক ৫ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ হয়েছে ১ হাজার ৯২ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে আরও ৩৪৮ উপজেলায় এই প্রকল্প চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এর ফলে, মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি, এর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ই ৬৫৭৬৭টি, যেখানে মোট শিক্ষার্থীসংখ্যা আট লাখের বেশি। তবে, এই সময়ে ঝরে পড়ার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা গত বছর ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদরা বলেন, এই পরিস্থিতিতে সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি। সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, স্কুলে মিড-ডে মিল কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। এটি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি শেখার ফলাফল উন্নত করতে সহায়তা করে। তবে, তিনি আরও বলেন, খাবারের মানে কোনও আপস হতে পারে না। স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পুলিশের ন্যায় তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিশেষ করে মায়েদের সমন্বিত অংশগ্রহণ ও যেন কোনও সিন্ডিকেটের কবলে না পড়ে, সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।
অভিযোগে হয়েছে, সরকারি দামে অনেকখানি বেশি দামে খাবার বিক্রি হচ্ছে, সেখানে কিছু প্রতিষ্ঠানে ১৪-১৫ টাকায় বানরুটি বিক্রি হচ্ছে। ডিম আগে থেকেই সিদ্ধ করে রাখা হচ্ছে এবং কলা কাঁচা বা পচা অবস্থায় দেয়া হচ্ছে।
তালতলী (বরগুনা) থেকে জানা গেছে, ওই উপজেলার কিছু স্কুলে পচা ডিম, খারাপ রুটি ও কলা সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ঠিকাদার গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার বিরুদ্ধে। এতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপ্রীতিকর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, শিক্ষার অগ্রগতি ঝুঁকির মুখে। দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ মার্চ শুরু থেকে কাঁচা পচা ডিম, কলা ও রুটি সরবরাহ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে শুরুতেই পচা ডিম ও খারাপ রুটি সরবরাহের অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীরা বলছে, দুই দিন দীর্ঘ একসঙ্গে দেয়া কাঁচা রুটি ময়লার মতো মনে হয়েছে। পচা ডিম থাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, যা খাওয়ার অযোগ্য।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তারা এসব খাবার খেতে চায়নি, কিন্তু বাধ্য হয়ে গ্রহণ করেছে। অনেকেই বলছেন, পচা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার দেওয়া হয় কারণে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় স্কুলে পচা কলা ও ডিম বিতরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম হয়, যেখানে অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীরা কলা ফিরিয়ে দিয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ নরসিঁদীতে জাতীয় পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ মানের ব্যাপারে সতর্কতা জারি করে বলেছেন, মানের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আরও তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন, পারদর্শী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত অপ্রত্যক্ষ ও সঙ্গে সঙ্গে তদারকি চালাতে।
তবে, কিছু স্কুলে যখন খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদারকি ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দায়িত্বশীল। ৫০ শিক্ষার্থী শারীরিকভাবে অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক স্কুলে। সংগৃহীত অভিযোগে আক্রান্ত হওয়ার সময়ের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে।
সরকারের কঠোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গত সোমবার এক জরুরি সভায় মিড-ডে মিলের অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বলবত থাকছে, শিক্ষার্থীর নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। সভায় বলা হয়, অনুমোদিত মানদণ্ডের বাইরে কোনো খাবার বিক্রি বা বিতরণ চলবে না। সরবরাহকারী ও চালকদের পরিচয় ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, যেকোন সাব-উপঠিকাদারীর ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
অতিরিক্ত সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে তদারকি জোরদার করতে হবে। এছাড়াও, বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে খাদ্য নিরাপত্তা ও মানের সরবরাহে নজরদারি আরও দৃঢ় করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সবশেষে, প্রতিমন্ত্রী বলেন, অবহেলা কিংবা অনিয়মের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিত হয় এবং এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি সফল হয়। এইসব কঠোর নির্দেশনা ও পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে, সরকারের আশা এই প্রকল্পের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে এবং শিশুদের সুরক্ষা ও উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।








