ঢাকা | শনিবার | ২৫শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১১ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

বাংলাদেশের ৫ জনের মধ্যে ২ জনের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই

বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় দুজন মানুষপুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সক্ষমতামুক্ত নয়। ২০২৫ সালের অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩৮.৬ শতাংশ বা আনুমানিক ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহ করতে পারেননি। এই হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, যা স্পষ্ট করে দেয় মানবিক ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতিসংঘের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন—‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’-এ এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এই প্রতিবেদনটি বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও পুষ্টির পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে, যেখানে দেখা গেছে যে কৃষি, খাদ্য ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমসাময়িক সমস্যা বিদ্যমান।

প্রতিবেদনের মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘হেলদি ডায়েট বাস্কেট’, যেখানে দাবি করা হয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অন্তত ২৩৩০ কিলোক্যালরি পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। এতে শর্করা, প্রাণিজ আমিষ, শাকসবজি, ফলমূল, শুঁটি জাতীয় উদ্ভিদ, বাদাম ও তেল-চর্বির মতো ছয়টি মৌলিক পুষ্টি উপাদান অন্তর্ভুক্ত। এই উপাদানগুলো শরীরের সঠিক বিকাশ, শক্তি উৎপাদন ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে অপরিহার্য, তবে বাস্তবতা δείকায় দেশের বিস্তীর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য এ ধরনের সুষম খাদ্য সংগ্রহ করতে অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে, শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য নিরাপত্তার এই সংকট গভীরতর। পাকিস্তানের পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুতর, যেখানে প্রায় ৬৩ শতাংশ মানুষই স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন। পাকিস্তানের পরেই এই অপ্রাপ্তি বাংলাদেশের মুখোমুখি হয়েছে; যেখানে দেশের স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি এমন খাদ্য কেনার ক্ষমতাও প্রায় অপ্রাপ্য হয়ে উঠছে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক পরিস্থিতিও দেশে খাদ্য সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩২.৭ শতাংশ মানুষ সুষম ও পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহে ব্যর্থ হবেন বলে ধারনা করছে বিভিন্ন গবেষণা, যেখানে আফ্রিকায় এই হার সর্বোচ্চ ৬৬.৬ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যের অযৌক্তিক ও আকাশচুম্বী দামই এই পরিস্থিতির জন্য মূল দায়ী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক মো. রুহুল আমিনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুধ, মাছ, মাংস ও ফলের মূল্য অনেকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ এগুলো খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশ্ববাজারে পণ্যের দামের ওঠানামার ফলে, প্রতিবার মূল্য বাড়লে স্থানীয় বাজারে তা দ্রুত বাস্তবায়িত হলেও, দর কমলে সাধারন ভোক্তা তা সহজে পেতে পারেন না। ফলে, আয় বাড়লেও স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার ক্ষমতা অসংখ্য মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত কিছু বছরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের দৈনিক খরচ অনেকটাই বেড়েছে। ২০১৭ সালে যা ছিল গড়ে ৩.০৯ ডলার, তা ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৪.৫৯ ডলার। মূল ব্যয়টি চলে যাচ্ছে প্রাণিজ আমিষ, ফলমূল ও শাকসবজি সংগ্রহে, যেখানে শর্করাজাতীয় খাবারে ব্যয় কম। এ অঞ্চলে খরচের দিক থেকে ভুটান ও শ্রীলঙ্কার পরে বাংলাদেশ অবস্থান করলেও, পাকিস্তানে এই খরচ কেবল ৩.৯৪ ডলার।

তবুও, দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের মধ্যে আশার কথা হলো, পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০১৭ সালে যেখানে দেশের প্রায় ৬২.৮ শতাংশ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারতেন না, সেখানে ২০২৫ সালে এই হার কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮.৬ শতাংশ। এর পেছনে মূল কারণ হলো, খাদ্যের দাম বাড়ার চেয়ে মানুষের আয় ও খাদ্য খরচের মধ্যে পার্থক্য আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া। ফলে, অনেক ক্ষুদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ এখন কিছুটা সক্ষম হয়েছেন পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহে।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যকর খাবারের গড় মূল্যও বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। ২০১৭ সালে এই খরচ ছিল গড়ে ২.৯৪ ডলার, যা ২০২১ সালে বেড়ে ৩.৪৪ ডলার এবং ২০২৫ সালে পৌঁছেছে ৪.২৮ ডলার। এই মূল্যবৃদ্ধির باوجود, এখনও বিশ্বে প্রায় ২.৬৯ বিলিয়ন মানুষ সুষম খাদ্য সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যদিও সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির সংকট কাটাতে দরকার সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর নীতিমালা। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ কমানো, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, বাজারের সিদ্ধান্তখুব তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং খাদ্য অপচয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাবারের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে গুরুত্বপূর্ণ।