মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত ব্যয় ও সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ২৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার) পৌঁছে গেছে। জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিশাল ঝটকা এবং কৌশলগত জলপথ—বিশেষত হরমুজ প্রণালিতে চলাচলে বাধা—এসব মিলিয়ে ব্যবসায়িক খরচ বাড়ছে এবং লাভজনকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক ডেটা বিশ্লেষণ করে এই চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে মোটামুটি ২৭৯টি কোম্পানি বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। কেউ পণ্যের মূল্য বাড়িয়েছে, কেউ উৎপাদন কমিয়েছে, কেউ লভ্যাংশ দেয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে। অনেকে কর্মীদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠাচ্ছে, আর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জরুরি আর্থিক সহায়তার জন্য সরকারের কাছে হাত বাড়িয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ও হরমুজ প্রণালিতে চলাচলে কড়াকড়ি পণ্য পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে সাপ্লাইচেইন স্থবিরতা গভীর হচ্ছে এবং কাঁচামাল-উৎপাদন থেকে শেষ বিক্রয় পর্যন্ত ধারা বন্ধও দেখা যাচ্ছে। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো এই তালচে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—কিছু কোম্পানি সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে, কিছু কোম্পানি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনায় বাধ্য।
ওয়ার্লপুলের প্রধান নির্বাহী মার্ক বিটজার পরিস্থিতির তীব্রতা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, বর্তমান অবস্থা ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার থেকেও ভয়াবহ জীবনের চিহ্ন দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, মানুষ নতুন কেনার বদলে পুরনো জিনিস মেরামত করে ব্যবহার করছে, ফলে বিক্রি কমে যাচ্ছে। বৈরীতাবস্থার কারণে ওয়ার্লপুল তাদের পুরো বছরের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হাফ করে দিয়েছে।
একইভাবে প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল (পিঅ্যান্ডজি), জাপানের টয়োটা ও মালয়েশিয়ার ক্যারেক্সের মতো বৃহৎ সংস্থাগুলোও দীর্ঘমেয়াদী লোকসানের সতর্কবার্তা দিয়েছে। টয়োটা ইতিপূর্বেই ৪৩০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য ক্ষতির কথা জানিয়েছে। এসব কোম্পানির বিবরণে দেখা যায় যে প্রসাধনী, বিমান পরিবহন ও টায়ার উৎপাদনকারীরাও সরাসরি আর্থিক ধাক্কায় পড়েছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে—কারণ ওই অঞ্চলে জ্বালানির ব্যয় আগে থেকেই উচ্চ। একই সঙ্গে এশিয়ার অনেক কোম্পানি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোও বেঁচে থাকার লড়াই করছে।
বৈশ্বিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় তাহলে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে এবং ভোক্তাদের আস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরবে। এর ফলস্বরূপ সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে গিয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদী মন্দার দিকে ঠেলে যেতে পারে। সরকার ও শিল্প নেতাদের জন্য দরকার দ্রুত সমন্বিত নীতি ও সহায়তার ব্যবস্থা, না হলে ক্ষতি আরও বাড়বে এবং পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হবে।








