রপ্তানি বাণিজ্যকে গতিশীল করে খরচ কমাতে আধুনিক, দক্ষ ও সমন্বিত লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব পুনরায় জোর দিয়ে বলেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। শনিবার মতিঝিলের ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত গোলটেবিলে তাঁরা সতর্ক করেছেন যে বর্তমান বন্দর ব্যবস্থাপনার ধীরগতি, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ডিসিসিআই-এর সিনিয়র সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী বৈঠকে বলেন, লজিস্টিক খাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা সরাসরি রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করছে। পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা ও আধুনিক পরিবহন সুবিধার অভাবে সরবরাহ শৃঙ্খল মন্থর ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। তিনি বন্দরগুলোতে ডিজিটেশন ও স্বয়ংক্রিয়তা বাড়িয়ে কার্যকারিতা উন্নত করতে এবং পিপিপি’র মাধ্যমে কোল্ড-চেইনসহ নতুন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম)-এর মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, রপ্তানি বাড়াতে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো প্রয়োজন; তাই সরকার ও বেসরকারি খাতকে মিলিয়ে লজিস্টিকস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম. মাসরুর রিয়াজ তাঁর মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে লজিস্টিকস ব্যয় ২৫ শতাংশ কমালে দেশের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আরো শক্ত প্রভাবের উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পণ্য পরিবহনের ব্যয় মাত্র ১ শতাংশ কমলেও রপ্তানি প্রায় ৭.৪ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বক্তারা বন্দর দক্ষতা বাড়ানো এবং রেলপথে পণ্য পরিবহনের ব্যপ্তি বৃদ্ধির ওপর একমত পোষণ করেন। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাক্তন কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান একটি সমুদ্রবন্দর বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালনার প্রস্তাব দেন যাতে কার্যকারিতা ও দ্রুততার সঙ্গে সেবার মান বাড়ানো যায়।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি বলেন অবকাঠামো, ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ও তথ্যপ্রযুক্তি একযোগে উন্নত করতে হবে যাতে রপ্তানি চেইন পুরোপুরি টেকসই হয়।
বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রতিনিধিরা কাস্টমস প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা, মাল্টিমোডাল লজিস্টিক হাব তৈরি এবং বড় প্রকল্প যেমন উন্নত ইন্টারনাল কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) সফলভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা মনে করেন এসব উদ্যোগ সফল হলে বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশে ব্যাপক উন্নয়ন আসবে এবং ব্যবসায়ীদের খরচ কমবে।
সামগ্রিকভাবে বক্তারা বলেন—ডিজিটাইজেশন, পিপিপি-ভিত্তিক বিনিয়োগ, কোল্ড চেইন ও মাল্টিমোডাল নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং কার্যকর নীতিগত সমন্বয় ছাড়া রপ্তানি শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় ফিরে আসতে পারবে এবং রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যাবে।








