রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে ছাত্র ও জনতার যৌথ গণঅভ্যুত্থান এক বিরাট মোড়ঘুণি ঘটনা। সকলের সম্মিলিত আন্দোলনের ফলেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটেছিল এবং হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে তাবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি এই কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে এ অধিবেশনকে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের সিঁড়ি বেয়ে শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়েই এই মহান জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়েছে। আমি স্পিকার মহোদয়ের মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই এবং এই সংসদে নির্বাচিত সকল সংসদ সদস্যকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জ্ঞাপন করছি।
রাষ্ট্রপতি মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন এবং স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ জাতীয় জীবনের সকল নেতার অবদানও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি ২০২৪ সালেরJuly–August গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতরা এবং দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের শিকারদেরও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন, যে ত্যাগের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হয়েছে।
বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ–২০২৫ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি স্মরণ করান যে, সরকার ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শিশুদের ৬০টি পরিবারের প্রত্যেকে এককালীন ৫০ হাজার টাকার সমমূল্যের প্রাইজবন্ড এবং সম্মাননা স্মারক প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি দেশের ইতিহাসে সংঘটিত বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদেরও স্মরণ করে বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছে, তাদের নীরব ত্যাগের মধ্য দিয়েই আগামীকালের দেশ গঠনের কাজ চলবে এবং সরকার সেই লক্ষ্যে অগ্রসর থাকবে।
অর্থনীতির অবস্থা সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বেশ দৃঢ় হয়েছে। রেমিট্যান্সসহ কয়েকটি সূচক ইতিবাচক দিকে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ ইউএস ডলার। সরকার আশা করে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বে যুদ্ধ-বিরোধী পরিস্থিতি ও দেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ—যেমন মুদ্রাস্ফীতি ও রাজস্ব জিডিপির নিম্নহার—এসব মিলে অর্থনীতিকে চাপ দিচ্ছে। তবুও পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালের জানুয়ারির ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ থেকে নেমে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে এসেছে এবং আশা করা যায় পরবর্তী মাসগুলোতে এই হ্রাস অব্যাহত থাকবে।
রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রার চিত্র নিয়ে তিনি প্রতিফলিত করেন, তৈরি পোশাক খাত থেকে গত এক বছরে ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার অর্জিত হয়েছে। পাট ও পাটপণ্য থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৭০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট রপ্তানি বেড়িয়ে এসেছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি নিয়ে, যা ৪৮ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ইউএস ডলারে দাঁড়ায়। রেমিট্যান্স প্রবাহও ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন ইউএস ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং টাকার বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ডলার প্রতি ১২২ দশমিক ৩০ টাকা।
সরকার স্বয়ংক্রিয় বন্ড ব্যবস্থাপনা চালু করেছে এবং আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য সহজে প্রাপ্তির লক্ষ্যে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট হাব চালু করেছে। ই-ভ্যাট কার্যকর করা হয়েছে, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, এবং প্রবাসী করদাতাদের জন্যও অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
আর্থিক খাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতিতে রাষ্ট্রপতি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে তদারকি কার্যক্রম উন্নতকরন, আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং খেলাপি ঋণ হ্রাসে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এই লক্ষ্যে একটি ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করে ব্যাংকিং শৃঙ্খলা, তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ব্যাংকিংয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, উচ্চ নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) পর্যালোচনা করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং দ্রুত কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা হবে। বিমা খাতের উন্নয়ন ও পুঁজিবাজার সংস্কারের জন্য ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ গঠন এবং গত পনেরো বছরে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, কারসাজি রুখে দেয়া, শক্তিশালী বন্ড ও ইক্যুইটি মার্কেট গঠন, করপোরেট বন্ড ও সুকুক চালু করা এবং প্রবাসীদের জন্য ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে খোলা হবে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও কাজ হবে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই এডিপিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, বেকারত্ব হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষি ও শিল্পের উন্নয়ন, মানবসম্পদ বিনিয়োগ ও জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বৈদেশিক অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারিত হয়েছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৩৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ ২০২৫ সালে ৭৫৩টি চলমান প্রকল্প পরিবীক্ষণ ও ১৭৮টি সমাপ্ত প্রকল্প মূল্যায়ন করেছে এবং ৩৫৩টি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।
অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণে রাষ্ট্রপতি জানান, বর্তমান সরকার অলিগার্কিক কাঠামো ভাঙে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় এবং ঋণভিত্তিক অর্থনীতিকে বিনিয়োগ-নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। বিনিয়োগ-নির্ভর অর্থনীতি হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সম্পদ সৃষ্টির মূল চালিকা শক্তি। সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। রাজস্ব ও মুদ্রানীতি সমন্বয় করে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি, কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস ও ইজ অব ডুয়িং বিজনেস উন্নত করাটিই স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর অগ্রাধিকার।
কৃষি খাত সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি বলেন, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় কৃষির বিশেষ অবদান আছে। সরকার কৃষক ও কৃষি উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ১১ লাখের বেশি কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছে। আম, আলুসহ বিভিন্ন ফসল সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন, বরেন্দ্র প্রকল্প পুনরায় চালু, কৃষি বিমা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাসহ অঞ্চলভিত্তিক রপ্তানি এলাকা গড়ে তোলা ও এগ্রোপ্রেনারশিপ স্টার্টআপ উদ্বোধন করা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ চাল, সবজি, পাট, আলু ও আম উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে।
ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশ ইতোমধ্যে মাছ, মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন প্রজাতির কৃত্রিম প্রজনন ও চাষাবাদের কৌশল উদ্ভাবন ও লাইভজিন ব্যাংক স্থাপন করেছে। সরকার নিরাপদ ফিড উৎপাদন, ভ্যাকসিন প্ল্যান্ট স্থাপন এবং পোলট্রি, মাংস ও ডেইরি খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দেবে। প্রতি উপজেলায় পর্যাপ্ত পশু-রোগ প্রতিষেধক ওষুধ সরবরাহ এবং ভেটেরিনারি সার্জন নিয়োগসহ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। মৎস্য খাতে জলমহাল, উপকূলীয় খাল ও হাওরের ইজারা প্রথা বাতিল করে ‘জাল যার জলা তার’ নীতির ভিত্তিতে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে স্পষ্ট হয়েছে যে, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন এবং সব পর্যায়ের মানুষের কল্যাণই সরকারের মূল উদ্দেশ্য। আগামী দিনে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রতি তাঁর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।








