মিরপুরে গত জুন ও জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নিহত শেখ শাহরিয়ারের বাবার দ্বিতীয় বিয়েকে ঘিরে নতুন বিতর্ক উঠেছে। অভিযোগ করা হচ্ছে—আব্দুল মতিন তার একমাত্র ছেলের নামে যে অনুদান ও সহায়তা এসেছে, সেগুলো ব্যবহার করেই তিনি গত ২৯ মে দায়িত্বরতভাবে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। বাবার এই পদক্ষেপ ও তহবিল ব্যবহারের অভিযোগে পরিবারে উত্তেজনা বাড়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের কুমড়াশসন গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল মতিন ও মমতাজ বেগম ২০০৪ সালের ৭ নভেম্বর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। তাদের একমাত্র ছেলে শাহরিয়ার ঢাকা মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণের সময় ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুলাই মারা যান। একমাত্র সন্তান হারানোর শোকমধ্যে পরিবারটি যখন শোকাহত ছিল, ঠিক তখনই এই দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনা নতুন বিতর্কের জন্ম দিল।
স্থানীয়রা ও নিহতের পরিবার সদস্যরা দাবি করেন, আব্দুল মতিন ২৯ মে সাত লাখ টাকা কাবিন এবং প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম বলেন, ‘‘সন্তান হারানোর শোকে আমি এখনও ভেঙে পড়িনি; সে শোক সামলানোর আগেই আমার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। আমি কখনই এ বিয়ের অনুমতি দেইনি। তার এ অর্থ জোগাড় করার সামর্থ্য ছিল না—এটি আমার ছেলের নামে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দেয়া অনুদান থেকে তোলা হয়েছে।’’
মমতাজ আরও অভিযোগ করেন, তার স্বামী শহীদ ছেলের নামে বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ সংগ্রহ করছেন এবং এমনকি জাল স্বাক্ষর করে পরিবারের জন্য ঘোষণা করা এককালীন ৩০ লাখ টাকার সরকারি সহায়তা উত্তোলনের চেষ্টা করেছিলেন, যা সফল হয়নি। তিনি বলেছেন, ‘‘আমি ২২ বছর সংসার করেছি। দুই স্ত্রী নিয়ে চলার মতো সামর্থ্য তার নেই। আমার একটাই চাওয়া—আমার মেয়ে যেন নিরাপদে বড় হয় এবং ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয়।’’
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, তিনি তার নিজের উপার্জন ও পরিবারের অনুরোধ, বিশেষ করে নিজের মায়ের অনুরোধে এবং বংশ রক্ষার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘সবকিছু আমি প্রথম স্ত্রীর জানিয়েই করেছি; এখন তিনি তা অস্বীকার করছেন।’’ নিজেকে ‘আলফা গ্রুপ’ এর মতিঝিল শাখার সেলস ম্যানেজার দাবি করে তিনি জানান, বিয়ের সব খরচ তার নিজের আয় থেকেই হয়েছে এবং ছেলের অনুদান ব্যবহারের অভিযোগ মিথ্যা। তবে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রীর পরিচয় প্রকাশ করেননি।
ঘটনাটি নিয়েও বিভিন্ন নাগরিক ও আন্দোলনকর্মীরা নিন্দা জানিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষ সমর্থক রুহুল আমিন রিপন বলেন, ‘‘একজন শহিদের বাবার কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশা করা যায় না—আমি তীব্র নিন্দা জানাই।’’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী আল নূর আয়াস বলেন, ‘‘এমন সিদ্ধান্ত একটি শহিদ পরিবারের পক্ষে গ্রহণ করা কষ্টকর। পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থাও বিবেচনা করে তিনি পারিবারিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারতেন।’’
এখন পরিবারের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়পরায়ণ বিচারের দাবি উঠেছে। স্থানীয় সমাজ ও আঞ্চলিক নেতারা ঘটনাটি নজরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে সরকারি বা আইনগত কোনো তদন্ত শুরু হয়েছে কিনা সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।








