ঢাকা | শনিবার | ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৭শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

সক্রিয় ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীরা’, বাড়ছে খুনোখুনি অস্তিত্ব জানান দিতে

কারাগারের অন্ধকার প্রান্ত থেকে ফিরে আসার পর আবারও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা মেতে উঠেছে নিজেদের পুরনো রক্তক্ষয়ী খেলায়। কেউ পুরনো শত্রুতার হিসাব মিলাতে মরিয়া হয়ে উঠছে, আবার কেউ নিজেদের হারানো সাম্রাজ্য ও আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছেন। ৯০ এর দশকের এই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা, যারা বর্তমানে বিভিন্ন সময় জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও সক্রিয়তা দেখাচ্ছে, তাদের কারণে দেশের অপরাধ জগৎ একবার আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে খুনোখুনি ও অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে গেছে ব্যাপক হারে।

গতকাল শুক্রবার, দেশের দুই বিশাল মহানগরী ঢাকা ও খুলনা, এগুলোতে প্রকাশ্যে দুজনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। খুলনায় একজন রাজনৈতিক নেতা নি:শেষ হয়েছেন, আর ঢাকার রামপুরায় এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর মাথায় গুলি লেগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তিনি এখন আইসিউতে লাইফ সাপোর্টে আছেন। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রাজধানীতে দ্বিতীয় কোনও শীর্ষ সন্ত্রাসীর ওপর এই ধরনের ঘটনা ঘটল।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খুনি যুবকদের হঠাৎ করে হেলমেট ও মাস্ক পরা অবস্থায় পায়ে হেঁটে পাশের বাসায় থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্লা পলাশকে খুব কাছ থেকে দু’টি গুলি করে। গুলিগুলো তার মাথায় সরাসরি লেগেছে, রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। হামলার সময় স্থানীয়রা ধাওয়া করলে, হামলাকারীরা দ্রুত চলে যায়, স্টার্ট দিয়ে রাখা মোটরসাইকেলে করে।

আহত পলাশকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে সন্ধ্যায় তার মাথা থেকে গুলি সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু গুলির আঘাতে তার মস্তিষ্কের বড় একটি অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বর্তমানে তিনি আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে আছেন, তার অবস্থা সংকটাপন্ন। ২০০২ সালে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজানকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত এই ব্যক্তি। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

অপরদিকে, খুলনায় পুলিশ বিশেষ অভিযান চালানোর সময় একজন বিএনপি নেতাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করায় শোরগোল উঠেছে। তার নাম রফিকুল ইসলাম, তিনি বিএনপির এক নেতা। তাকে কাজীপাড়ার বাজারে এক যুবক গুলি করে হত্যা করে, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লেগেছে। নিহত রফিকুল ‘ঢাকাইয়া রফিক’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি লবণচরা থানার বিএনপির সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

পুলিশ বলছে, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও শত্রুতার নিশ্চয়তা রয়েছে। এই ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও তদন্ত চলছে। এ বছরের প্রথম ছয় মাসে খুলনা মহানগরীতে ১৭টি হত্যাকাণ্ড এবং আগস্টের পরে থেকে এখন পর্যন্ত ৩৪টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, এর সঙ্গে বিভিন্ন আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্রুপের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে পুলিশ রিপোর্টে।

অতীতে একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী, যারা ২০০১ সালে ঘোষিত তালিকার অন্তর্গত ছিলেন, তারা দীর্ঘদিন কারাগারে থেকেও ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছে শেখ আসলাম বা ‘সুইডেন আসলাম’, আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, ইমন, ‘ফ্রিডম রাসু’সহ আরও কয়েকজন। অনেকের বয়স এখন ৫০-৬০ বছরের বেশি, অনেকেই পেছনে থাকলেও তারা এখন আড়ালে থেকে নতুন প্রজন্মের শুটার ও গ্যাং নেতা Guide করছেন। এদের আবার কেউ কেউ বিদেশে পলাতক, তবে তাদের নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয় রয়েছে।

প্রসঙ্গত, কিছু সময় আগে নিহত হয় খন্দকার নাঈম আহমেদ ‘টিটন’, তিনি দীর্ঘদিন আস্তানায় ছিলেন। তার হত্যাকাণ্ড একইভাবে আধিপত্য ও শত্রুতা থেকেই হতে পারে বলে ধারণা। পাশাপাশি, অন্য পলাতক অপরাধীদের মধ্যে রয়েছে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ, যারা এখনো ফেরার চেষ্টা করছেন বা গোপনে আছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সর্বনাশের পরিস্থিতিতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্ট ও কঠোরভাবে এদের মোকাবিলা করতে হবে। এদের প্রতিদিনের কার্যকলাপের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে, জামিনে এসেও যদি তারা আবার অপরাধে জড়ায়, তাহলে যেন দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করা যায়। অন্যথায়, দেশের বড় শহরগুলো আবারও ১৯৯০ এর দশকের মতো অস্ত্র ও রক্তের নানা গল্পে ভরপুর হয়ে যাবে। সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও খুনোখুনির ঝুঁকি দূর করতে হলে এখনই কঠোর ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায়, দেশের পরিবেশ আবার অস্থির ও অরক্ষিত হয়ে উঠবে।