চলমান যুদ্ধবিরতির মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। আল জাজিরা ও বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানের কয়েকটি শহরে ইসরায়েলি হামলা চালায়।
রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদসূত্র বলছে, ইসরায়েলি হামলার ফলে তেহরান, তাবরিজ ও ইসফাহানসহ কয়েক শহরে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনে যায়। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ তেহরানে অন্তত দুটি, ইসফাহানে অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের খবর জানিয়েছে। তবে এখনও বিস্তর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য বা হতাহতের স্বতঃসিদ্ধ তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পটভূমি: গত কয়েক দিন ধরে লেবাননে ইসরায়েলের হামলার অভিযোগ আনা হয় এবং এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান উত্তর ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে বলে প্রচার হয়। এরপরই পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইসরায়েল ইরানের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে ‘নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তু’কে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে—আইডিএফের (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী) দেওয়া বিবৃতিতে এমনটাই বলা হয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এই হামলা “টানা সপ্তাহব্যাপী আক্রমণের সূচনা” মাত্র। আইআরজিসির অ্যারোস্পেস কমান্ডার মজিদ মুসাভি বলেছেন, তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়েছে। আইডিএফের মুখপাত্র এফি ডেফরিন সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেছেন, ইরানি শাসকগোষ্ঠীর একটি মারাত্মক হিসেবভ্রষ্টি হয়েছে। আইডিএফ দাবি করেছে, উত্তর ইসরায়েলে ধেয়ে আসা বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করা হয়েছে এবং এই ঘটনায় ক্ষতি বা প্রাণহানির কোনো খবর নেই।
হামলার প্রভাব গণপরিবহন ও সীমান্ত সেবা গলিয়ে দিয়েছে। তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে, এবং পরবর্তী ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে—স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী। ইসরায়েলও উত্তরাঞ্চলে ইরানের হামলার জবাবে গাজা সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংগুলো—রাফাহ ও কেরেম শালম—আবার বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে; এসব পথ গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর মুখ্য রুট।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং কর্মচারীদের নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন বলে আয়ত্তভুক্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে। ট্রাম্প এক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পুরো পরিস্থিতি তিনি নিজে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিরাও ঐ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সৌদি আরব ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে টেলিফোন যোগাযোগ হয়েছে; তারা অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আরও দাবি করেছে, প্রতিশোধ হিসেবে ইরান নিজেও ইসরায়েলের হাইফায় একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে—যা, তাদের বক্তব্যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলীয় হামলার জবাব। আইআরজিসি সতর্ক করেছে, বেসামরিক বা জ্বালানিসংক্রান্ত লক্ষ্যবস্তুতে আরও হামলা হলে তার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়বে।
ইসরায়েলি ভূখণ্ডেও সতর্কতা জারি—জেরুজালেমসহ মধ্য ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ অংশে যুদ্ধকালীন সাইরেন বাজানো হয়েছে এবং দেশের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ জানায়, ইয়েমেনের দিক থেকেও বিভিন্ন ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের চেষ্টা হয়েছে বলে নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রে খবর; সাধারণ মানুষকে আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিগত ঘটনাবলীর মধ্যে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে এক গত ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত দুইজন নিহত ও ২০ জন আহত হওয়ার খবর রয়েছে—যা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
বিশাল আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেবে কিনা—এই উদ্বেগ পুরো অঞ্চলজুড়ে বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক সমাজের মধ্যে দ্রুত শান্তি ও সংযম আহ্বান বাড়ছে, অথচ মাঠে প্রতিপক্ষের কড়া প্রতিক্রিয়া এবং উভয়পক্ষের বক্তব্য কূটনৈতিক চেষ্টা কঠিন করে তুলছে। পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা ও বাস্তব ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিশ্চিত হতে সময় লাগবে। সংবাদ সংস্থাগুলোর এবং সরকারি ঘোষণার আপডেট অনুসরণ করা হচ্ছে।








