ঢাকা | মঙ্গলবার | ৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৩শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

উপকূলের নারীদের জন্য লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মারাত্মক

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বেড়ে চলা লবণাক্ততা কৃষি ও পরিবেশের জন্য গভীর সংকটের সৃষ্টি করছে। এই সংকটের মূল ঝুঁকিতে রয়েছেন স্থানীয় নারী বলেই জানা গেছে। সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৮৬ শতাংশ নারী প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণাটি পরিচালনা করে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি)।

গবেষণায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন থেকে লবণাক্ত পানির সংস্পর্শ, সাপ্লাই যাতায়াতে ব্যর্থতা, এবং পুষ্টির অভাবে এই নারীদের শরীরে বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। জানা গেছে, তারা প্রায়ই জলবায়ু দুর্যোগের শিকার হন, যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় প্রভাবিত ৯২ শতাংশ নারী এবং লবণাক্ততার প্রভাব পড়া ৬৩ শতাংশ নারী রয়েছেন। পাশাপাশি, নিরাপদ পানির অভাবে ৮৩ শতাংশ নারী ঝুঁকির মধ্যে থাকছেন। তারা সাধারণত বৃষ্টি পানির ওপর বা লবণাক্ত নলকূপের পানি উপর নির্ভর করেন। অনেকেই বেশি দামে পানি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কিছু নারী দূষিত পানি পানের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ত ও দূষিত পানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশ অনিয়মিত ঋতুস্রাবের সমস্যা নিয়ে ভুগছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪০০ নারীর মধ্যে ৮৬ শতাংশই প্রজননতন্ত্রে সংক্রমণের উপসর্গের সম্মুখীন। এসব নারীরা গৃহস্থালি কাজে, পানি সংগ্রহে, নদ-ঘের বা কৃষিজমিতে দীর্ঘসময় অজস্র সংস্পর্শে থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।

এতসব সমস্যা আরও গভীর হয়ে উঠছে কারণ বেশিরভাগ পরিবারই অর্ধেকেরও বেশি মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার কম। শিশুদের পুষ্টির জন্য প্রোটিনের অভাব, জলবায়ু দুর্যোগের কারণে কৃষি ও জীবনযাত্রার ক্ষতি সমাজের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ।

একই সময়ে সরকারি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অনিয়মিত বরাদ্দের কারণে এই পরিস্থিতি আরও নিরসন হচ্ছে না। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ২.৭৪ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ সালে কমে গিয়ে ১.৯৭ শতাংশে পৌঁছিয়েছে। বাজেটের এই ঘাটতিকে পূরণে উদ্যোগের অভাব দেখা যায়, ফলে জলবায়ু সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান অনিশ্চিত।

বিশেষজ্ঞরা বাজেটের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য ও উপকূলীয় নারীদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা ও বরাদ্দের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, জোরদার অর্থায়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার এবং জলবায়ু বিষয়ক নীতিমালার প্রতি আরও মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সরকারের আর্থিক কর্মকর্তারা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সম্পর্কিত বাজেট ও প্রকল্পগুলোকে আরও সুসংগঠিত ও স্বচ্ছ করতে হবে। গবেষক ও সরকারি কর্মকর্তারা মনে করেন, এর মাধ্যমে উপকূলের নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নত করা সম্ভব হবে। এই সংকট মোকাবিলায় আরও প্রয়াসের জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।