ঢাকা | শনিবার | ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ায় অঙ্গীকার প্রধান উপদেষ্টার

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে আমরা কঠোর পরিশ্রম করছি, যাতে জনগণের হাতে ক্ষমতা নির্বিঘ্নে হস্তান্তর করা যায়। তিনি আরও জানান, ‘‘আমরা গণতন্ত্রের মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলতে এবং ক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’’

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবস্থিত মালয়েশিয়া ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় (ইউকেএম) থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণকালে প্রধান উপদেষ্টা এই কথা বলেন। ইউকেএম এর অডিটোরিয়ামে এক আনন্দদায়ক পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এবং নেগেরি সেমবিলানের সুলতান তুংকু মুহরিজ ইবনি আলমারহুম তুংকু মুনাওয়িরর কাছ থেকে তিনি এই সম্মাননা গ্রহণ করেন। সামাজিক ব্যবসার প্রসারে তার অভূতপূর্ব অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান প্রদান করা হয়।

ড. ইউনূস বলেন, ‘‘এই সম্মাননা আমাকে তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণে আমার দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয়। গত বছর বাংলাদেশের অনেক তরুণ সাহসিকতার সঙ্গে একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। শত শত ছাত্র-যুবক একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে, যেখানে প্রত্যেকে মর্যাদার সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে আর ভয়, বৈষম্য ও অন্যায়ের মুখোমুখি হবে না।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের সরকার নতুন বাংলাদেশ গড়তে কাজ করছে, যা ন্যায়সঙ্গত শাসন ব্যবস্থা, সমঅধিকারভিত্তিক অর্থনীতি এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থান আমাদের জাতির পরিচয় ও আশা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। আমরা শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পদক্ষেপ নিচ্ছি।’’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘‘আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার সংস্কার। আমাদের দৃঢ় সংকল্প রয়েছে সম্মিলিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার এবং অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাতে উদ্যোক্তাদের সহায়তা বৃদ্ধি পায়, শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে ওঠে।’’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘‘তোমরা ভবিষ্যতের নির্মাতা। তোমাদের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধই আগামী দিন গড়ে তুলবে — শুধু মালয়েশিয়ারই নয়, সমগ্র বিশ্বের। স্বপ্ন পূরণের পথে এগোতে গিয়ে সবসময় মনে রেখো, প্রকৃত সাফল্য শুধু নিজের অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অন্যদের সঙ্গেও উন্নতির পথ ভাগাভাগি করাই সত্যিকারের সাফল্য।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘বিশ্বকে বদলাতে প্রকৃত নেতা ও সমস্যা সমাধানকারীদের প্রয়োজন। তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যে রয়েছে অসাধারণ কিছু করার ক্ষমতা — মানুষসেবায় ব্যবসা গড়ে তোলা, জীবন বদলানোর নতুন ধারণা তৈরি করা, বা এমন নীতি প্রণয়ন করা যা বৃহত্তর সম্প্রদায়কে উন্নত করবে।’’

ড. ইউনূস উল্লেখ করেন, ‘‘আজকের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো সম্পদের কেন্দ্রীকরণ যা কিছু সংখ্যক মানুষের হাতে концент্রেট হচ্ছে, যার ফলে বৈষম্য ও অন্যায় বাড়ছে। আমাদের প্রয়োজন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি যেখানে সম্পদ ন্যায়সভভাবে ভাগ হবে এবং প্রত্যেকে মর্যাদা ও সুযোগ পাবে।’’

তিনি নিজের কর্মজীবনের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘‘আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ দিয়ে, এরপর প্রতিষ্ঠা করেছি গ্রামীণ ব্যাংক যেখানে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালিয়ে মানুষকে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করেছি। আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি দরিদ্ররা প্রতিভাহীন নয়, বরং তাদের ন্যায্য সুযোগ দেওয়া হয় না।’’

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর বন্ধুত্বের কথাও স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘‘দুই দেশ মৈত্রী ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে একে অপরের উন্নয়নে সহযোগিতা করে আসছে। আমরা বাণিজ্য, শিক্ষা, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে যৌথ অগ্রগতি করেছি।’’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘বাংলাদেশ এখন নতুন যুগে প্রবেশ করেছে এবং আমরা মালয়েশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চাই। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, হালাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রগুলিতে একসঙ্গে কাজ করে একটি স্থিতিশীল, উদ্ভাবনী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব।’’

সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করায় মালয়েশিয়া ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমি এই সম্মানগ গ্রহণে কৃতজ্ঞ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার বন্ধন আরো দৃঢ় করার অঙ্গীকার করি। আশা করি, আমরা পারস্পরিক শিক্ষা ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখব, যাতে একটি সমৃদ্ধ বিশ্বের সৃষ্টি করতে পারি যেখানে সবাই নিজের সক্ষমতা বিকশিত করার সুযোগ পাবে।’’

অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জাম্ব্রি আব্দুল কাদির এবং ইউকেএম ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. সুফিয়ান জুসোহ উপস্থিত ছিলেন।