কার্যাদেশের ঘাটতি, মালিকদের তীব্র আর্থিক সংকট, শ্রমিক অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট মিলিয়ে গত দুই বছরে দেশের ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বৈশ্বিকভাবে তৈরি পোশাক চাহিদার পতন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং ভৌগোলিক-রাজনীতিক অস্থিরতা ও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক জটিলতাগুলো সামগ্রিক শিল্প ক্ষেত্রকে বড় ধরনের সঙ্কটে ঠেলে দিয়েছে। শিল্প পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হওয়া ৪৫৭টির মধ্যে ৩৯৮টি গাজীপুর, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে অবস্থিত, ফল হিসেবে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের কারখানার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি — প্রায় ২৮৭টি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাগই বিভিন্ন পোশাক সঙ্ঘের আওতাধীন; হিসেবে আছে বিজিএমইএ’র ১০৮টি, বিকেএমইএ’র ৩৫টি, বিটিএমএ-র আটটি এবং বেপজা’র আওতাধীন ১৯টি প্রতিষ্ঠান।
চিত্র আরও বাড়তি খারাপ: কেবল চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (৩১ মে পর্যন্ত) কাজ ও কার্যাদেশ হ্রাস পাওয়ার কারণে ৭৯টি কারখানা মোট ৭ হাজার ৭৮৪ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে। সর্বশেষ সপ্তাহে গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্স ও ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড নামের দুটি বড় কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার ফলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক একযোগে চাকরি হারিয়েছেন। এর আগে আল-মুসলিম গ্রুপও তাদের কারখানা থেকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়।
এই চরম বিপর্যয় থেকে শিল্প খাতকে টেনে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের জন্য আরও ৫ হাজার কোটি টাকার পৃথক বিশেষ তহবিল ঘোষণা করেছে। উদ্দেশ্য—কারখানা ধরে রাখা, উৎপাদন ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান রক্ষা করা।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছেন, ঘোষিত প্যাকেজটির শর্তাবলী কঠোর এবং জামানতসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এই জরুরি ঋণ সুবিধা নিতে পারছেন না। বিজিএমইএ ও অন্যান্য গ্রুপগুলি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রদত্ত ব্যবস্থায় বাস্তবসম্মততা ও সহজলভ্যতা চেয়ে ভূমিকা রেখেছে।
বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন যে সিআইবি (CIB) রিপোর্ট সন্তোষজনক না থাকায় এবং অন্যান্য অপ্রতুলতার কারণে সব বন্ধ কারখানাই চালু করা সম্ভব নাও হতে পারে। সংগঠনের সহসভাপতি শিহাব উদদোজা চৌধুরী বলেন, বর্তমানে প্রায় ২০০টি সম্পূর্ণ বন্ধ এবং ১২৩টি আংশিক বন্ধ কারখানা সরকারের আর্থিক প্রণোদনা পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বিজিএমইএ দাবি করছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সিএমএসএমই খাতের জন্য ৭ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ, ন্যূনতম ডাউনপেমেন্ট এবং সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে তারা বন্ধ বা আংশিক বন্ধ কারখানাগুলো প্রকৃতভাবে কী অবস্থায় আছে তা যাচাই করার জন্য ইতোমধ্যে দুটি স্বাধীন অডিট প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে; তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠানো হবে।
শিল্পখাত উদ্ধার করা না হলে শুধু কারখানা বন্ধের সংখ্যা বাড়বে না, বরং অতিরিক্ত কর্মসংস্থান ক্ষতি ও সামাজিক প্রভাবও বাড়বে—এই উদ্বেগ তুলে ধরেই শিল্প ও অর্থনীতির সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দ্রুত কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে।








