ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে এক তীব্র তাপপ্রবাহ চলমান; এতে মৃত্যু বাড়ছে এবং আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত সক্রিয় হওয়া ‘এল নিনো’ এই বিপর্যয়কে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলতে পারে। জাতিসংঘও পরিস্থিতিকে ‘‘জরুরি জলবায়ু সতর্কতা’’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে এল নিনোর মিলিত প্রভাব পারদ অসামঞ্জস্যভাবে বাড়িয়ে দেবে এবং একই সঙ্গে বন্যা ও খরার মতো রেকর্ডভাঙা চরম আবহাওয়ার ঘটনাকে ত্বরান্বিত করবে। এই প্রেক্ষাপটে ইতোমধ্যেই এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত মানুষ অতিরিক্ত গরমের আঁচ অনুভব করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের ৮৫০টির বেশি বড় শহরের প্রায় অর্ধেকই ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপীয় চাপে আছে। অতিরিক্ত তাপ ও আর্দ্রতার কারণে ঘাম সহজে শুকায় না, ফলে শরীরের ঠাণ্ডা রাখার ক্ষমতা কমে যায় এবং স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকি বাড়ে।
দেশভিত্তিক পরিস্থিতি কর্ণফুলী: স্পেনে MOMO মনিটরিং সিস্টেমের হিসাব অনুযায়ী দাবদাহে অন্তত ৩২৭ জনের মৃত্যু ثبت হয়েছে। বার্সেলোনার কাছের এক বন ঝরনে আগুন লেগে প্রায় ১৬ হাজার মানুষকে বাড়ির মধ্যে আটকে থাকতে হয়েছে। ফ্রান্সে তীব্র গরমের কারণে হাসপাতালগুলোতে জরুরি পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে; গরমে ঘরের গরম গাড়িতে আটকে কিছু শিশুর প্রাণহানির খবরও এসেছে, এবং দাবদাহ শুরু হওয়ার পর সাঁতারকালে পানিতে ডুবে ফ্রান্সে ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
জার্মানি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে ২৬ জুনের তাপমাত্রা জুনের আগের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। সারব্রুকেনে (জার্মানি) রেকর্ড ৪১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস নথিভুক্ত করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের লিমবার্গে ৩৯.৪ ডিগ্রি, যুক্তরাজ্যের সাফোকের ক্যাভেন্ডিশে ৩৭.১ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে। ২৬ জুনের ওই তাপপ্রবাহে ইউরোপের অন্তত ১৫ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার মুখে পড়ে।
স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ায় বহু বড় অনুষ্ঠান বাতিল করতে হচ্ছে: বিভিন্ন কনসার্ট, ম্যারাথন ও গণজমায়েত বন্ধ করা হয়েছে। প্যারিসে হাসপাতালব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে; প্যারিস প্রাইড মার্চ, মিউজিক ফেস্টিভালসহ কয়েকটি বড় অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। জার্মানিতে কিছু ম্যারাথনও স্থগিত করা হয়েছে, যদিও কিছু ক্রীড়া আয়োজন রোদ কমলে অনুষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বাস্তুতন্ত্র ও অবকাঠামোতেও প্রভাব পড়ছে: সুইজারল্যান্ডে বেজনউ (Beznau) পারমাণবিক কেন্দ্রীের দুটি রিয়্যাক্টর বন্ধ করা হয়েছে কারণ নিকটবর্তী নদীর পানি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে রিয়্যাক্টর ঠাণ্ডা করতে অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া কোলন থেকে প্যারিসগামী একটি ইউরোস্টার ট্রেন ব্রাসেলসের কাছে প্রায় ৪০০ যাত্রী নিয়ে বিকল হয়ে পড়ে; তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে তিন যাত্রীকেই হাসপাতালে নেওয়া হয়।
গ্লোবাল পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে: ওয়ার্ল্ড মেটিওরলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (WMO) এবং কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই বাড়ছে, এবং ইউরোপ কোর অঞ্চলে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে। WMO বলছে, আগামী আগস্টের মধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ এবং নভেম্বরের মধ্যে এটি পূর্ণ শক্তি নিয়ে উঠবে এমন সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। এর ফলে আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
বিশেষ সতর্কবার্তা ও প্রভাব: ডব্লিউএমওর মডেল অনুযায়ী এবারের এল নিনো প্রভাব কিছু অংশে তীব্র খরার দিকে এবং অন্যত্র ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে — সংক্ষেপে ‘কোথাও খরা, কোথাও বন্যা’। ছাড়াও সুইস গ্লেসিয়ার গবেষকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, অচিরেই হিমবাহের গলন শুরু হবে, যা সাধারণত আগস্টে দেখা যায়; এবার গলন গতিশীলতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একই সময়ে জাপানে ভারী বৃষ্টি-ঝড় আঘাত হেনেছে এবং ব্রাজিলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান: জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই সংকটকে কঠোর ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন—তিনি বলেছেন, এল নিনো উষ্ণায়নের ক্ষতি বাড়াতে পারে এবং এর মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানিকে গুরুত্বহীন করা ছাড়া কার্যকর সমাধান নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ রূপান্তর দ্রুত আনার কথা তিনি জোর দিয়েছেন।
সমাপনী মনে করিয়ে দেওয়া: সামনের দিনগুলোতে তাপপ্রবাহ আরও ছড়াতে পারে—বৃহৎ জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি, অবকাঠামো সমস্যাও বাড়ছে। সরকারি এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে জনসচেতনতা, সংগ্রহশালা এবং জরুরি পরিষেবা শক্তিশালী করার পরামর্শ বিজ্ঞানীদের। ব্যক্তিগতভাবে সবাইকে হাইড্রেশন বজায় রাখা, বাইরে কাজের সময় সতর্কতা নেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় একা না থাকা মতো সাধারণ সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হচ্ছে।








