পবিত্র ঈদুল আজহার আগে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে কোরবানির পশুর হাটগুলোতে সরগরম ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঈদের কয়েক দিনের ব্যবধান থাকায় গাবতলী, বসিলা, আফতাবনগরসহ স্থায়ী ও অস্থায়ী হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখরিত। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত পশুবাহী ট্রাক পৌঁছাচ্ছে।
হাট ঘুরে দেখা যায়—খামারিেরা কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে তাদের সেরা পশু এনে আলাদা অংশে ভিড় জমাচ্ছেন। তবে সরবরাহ থাকলেও দাম নিয়েই ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে কড়া দরকষাকষি চলছে। বিক্রেতারা বলছেন, হাটে পশুর অভাব নেই; ভোক্তা দর লাগে নাকি নয়—তাই শেষ মুহূর্তে দাম কিছুটা নেমে আসবে বলে আশা করছেন।
কুষ্টিয়া থেকে আগত খামারি মো. রহমত আলি বলেন, “হাটে মানুষ আসছে অনেক, কিন্তু অনেকেই এখনও দেখছেন ও দাম যাচাই করছেন। দুই-এক দিনের মধ্যে বিক্রি ভালো হবে আশা করছি।”
ক্রেতারা জানান, গত বছরের তুলনায় এবারে পশুর দাম একটু চড়া। বেসরকারি চাকরিজীবী আহসান হাবীব জানান, “বাজেটের মধ্যে গরু মেলা এখন কঠিন। এক লাখ থেকে এক লাখ বিশ হাজার টাকায় যে গরুগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোর আকার ছোট। মধ্যম সাইজের গরুর দাম দেড় লাখ থেকে পৌনে দুই লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে।”
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, গো-খাদ্য ও অন্যান্য কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং খামারের পরিচালনায় ব্যয়ের কারণেই দাম বেড়েছে। তবু বিক্রেতারা আশ্বস্ত করছেন যে হাটে পর্যাপ্ত পশু রয়েছে—সুতরাং চাহিদা অনুযায়ী শেষ মুহূর্তে দাম ক্রেতাদের নাগালে চলে আসবে।
এবার বিশেষভাবে দেখা যাচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের চাহিদা বাড়ায় ৮০ থেকে ১৫০ কেজি মাংস দেবে এমন মাঝারি আকারের গরুর ওপর ভিড় বেশি। নগরায়ন ও ফ্ল্যাট জীবনের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে মধ্যবিত্তের বাজেট মিলে এই আকারের গরুর চাহিদা বাড়ছি। হাট ইজারাদারদেরও ধারণা, বড় রাজকীয় নামের গরুতে কৌতূহল থাকলেও বাস্তবে বিক্রি বেশি হচ্ছে মাঝারি ও ছোট আকারের গরুগুলো। অনেকে ঝামেলা এড়াতে হাটের শুরুতেই পছন্দের পশু কিনে ফিরছেন।
দেশি খামারিদের সুরক্ষায় সীমান্তে কড়াকড়ি জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি ও খামারিদের দাবি মেনে বিজিবি সীমান্তে টহল বাড়িয়েছে যাতে অবৈধভাবে বিদেশি পশু দেশের বাজারে প্রবেশ না করে। তবে কিছু হাটে ভারতীয় গরু মিলেছে বলে খামারিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন—তারা বলছেন, বিদেশি পশু ঢুকলে দেশি খামারিরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। সরকার জানিয়েছে, চোরাচালান রোধে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে।
হাটে আরেকটি বড় সমস্যা জাল টাকার কেলেঙ্কারি। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা সরল খামারিরা প্রায়ই জাল টাকার শিকার হন—এই অনিয়ম ঠেকাতে প্রতিটি হাটে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় বিনামূল্যে জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ স্থাপন করা হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতারা লেনদেনের সময় সেই মেশিনে টাকার সত্যতা পরীক্ষা করতে পারবেন। পুলিশের তৎপরতায় সিসিটিভি ও ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়েছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পাহারা দিচ্ছে, যাতে হাটে অনিয়ম কমে। পাশাপাশি মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে ইজারাদারদের অতিরিক্ত অনিচ্ছাকৃত আদায়রোধ করা হচ্ছে।
প্রয়াস দেখা যাচ্ছে হাটকে ডিজিটালেও সম্প্রসারিত করতে—অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ছবি, ভিডিও ও লাইভ ওজন দেখিয়ে অনেক ক্রেতাই ঘরে বসে গরু কিনে নিচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি এই প্ল্যাটফর্মগুলো যাচাইকৃত পশু ও স্বাস্থ্য সনদসহ পরিষেবা দিচ্ছে, ফলে যাতায়াতের ঝামেলা ও কাদা-পানির সমস্যা এড়ানো যায়।
সব মিলিয়ে উৎসব আমেজে রাজধানীর পশুর হাট প্রস্তুত। খামারি আশা করছেন তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবে, আর ক্রেতারা চান সক্ষমতার মধ্যে সুস্থ ও সুন্দর পশু কোরবানি করতে পারবেন। নিরাপত্তা-তদারকি, পর্যাপ্ত দেশি সরবরাহ ও কৃত্রিম সংকট রোধে সরকারি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ থাকায় এবারের কোরবানির হাট ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করি সবাই।








