ঢাকা | বুধবার | ২২শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৮ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

বাপেক্সের তিন কূপ খননে সম্ভাব্য ১ লাখ ২০ হাজার ৮৫১ কোটি টাকার গ্যাস

চুলায় ধোঁয়া নেই, কারখানায় স্থবিরতা—জ্বালানি সংকটের ধার ছেঁড়ে দেশের জনজীবন ও শিল্পনীতি কষ্টে আছে। স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় উচ্চমূল্যে এলএনজি ও এলপিজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়ে গেছে; ফলে সাধারণ ভোক্তা ও রাষ্ট্রীয় বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডারে চাপ বাড়ছে।

এই ক্রান্তিকালে ঠিকঠাক সময়ে আশার সুর তুলে ধরেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে বাপেক্স ৭২৯ কোটি ২২ লাখ টাকার ব্যয়ে তিনটি নতুন কূপ খননের প্রস্তাব নিয়েছে।

প্রস্তাবিত খনন কাজ অনুযায়ী নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা এলাকায় মোট তিনটি কূপ খনন করা হবে। কারিগরি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব কূপ থেকে প্রায় ৭১১ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান এলএনজি দর ধরা হলে এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা হিসেবে আনুমানিক নিরূপণ করা হয়েছে।

প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস যোগ হবে, যা বিদেশি জ্বালানির ওপর বহুলাংশে নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

অর্থায়নের বিবরণ অনুযায়ী প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হবে ৫৮৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং বাপেক্স নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেবে ১৪৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আজ মঙ্গলবার (বা আজকের দিন অনুযায়ী) এটি একনেকের সামনে অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়েছে।

কারিগরি দিক থেকে কাজের ধরন এমন যে নোয়াখালী অঞ্চলে বেগমগঞ্জ-৫ নামক একটি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ ৩,৫৫০ মিটার গভীরতায় এবং বেগমগঞ্জ-৬ নামক অনুসন্ধান কূপ ৩,৪০০ মিটার গভীরতায় খনন করা হবে। সুনামগঞ্জের সম্ভাবনাময় সুনেত্র ভূগঠনে সুনেত্র-২ অনুসন্ধান কূপটি সমন্বিত খনন অপারেশন বা টার্ন-কি ভিত্তিতে ৫,৩০০ মিটার গভীরতায় খনন করার পরিকল্পনা রয়েছে। কাজের সঙ্গে যুক্ত বাড়তি খরচ হিসেবে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ, জমির উন্নয়ন এবং দেশি-বিদেশি আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তথ্যগতভাবে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫৫০ কোটি ঘনফুট, যেখানে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৬০–২৬৫ কোটি ঘনফুট। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতিনিয়ত বহুজাতিক চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হওয়া কঠিন; তাই সুযোগ-সীমা বিবেচনা করে দেশীয় অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করাও দরকার।

প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে শতভাগ সফলতার নিশ্চয়তা কোথাও নেই—তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশীয় সক্ষমতা কাজে লাগানোই যুক্তিযুক্ত উপায় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সরকারের এই উদ্যোগ সফল হলে দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় সম্পদের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং সংকটের সময়ে কোটি কোটি ডলারের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে।