রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তিনটি কর্পোরেট নেটওয়ার্ক—এবিসি, এনবিসি ও সিএনএন—কে তাদের লাইসেন্স বাতিল করার হুমকি দিয়েছেন। অভিযোগের সূত্রপাত সেই প্রাইম-টাইম ভাষণ সরাসরি ওই নেটওয়ার্কগুলোর মূল চ্যানেলে সম্প্রচার না করার ঘটনা থেকে, যা চার মাস পর অনিবার্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স শুক্রবার (১৭ জুলাই) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ট্রাম্প বলেন, এসব নেটওয়ার্ক তাঁর ভাষণ সম্প্রচার না করে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেছে এবং এর কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘এনবিসি এবং এবিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা এই ভাষণ সম্প্রচার করবে না। এ ধরনের প্রতারণার শাস্তি হওয়া উচিত — তাদের লাইসেন্স বাতিল।’
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা মনে করান যে, মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুসারে সংবাদমাধ্যমগুলোকে তাদের কনটেন্ট নির্বাচন করার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। তবুও প্রচলিতভাবে জাতীয় গুরুত্বের প্রেসিডেন্ট ভাষণগুলো প্রধান নেটওয়ার্কগুলো সরাসরি পরিবেশনের মাধ্যমে জনগণকে পৌঁছে দেয়, এটাই সাধারণ প্রত্যাশা।
নেটওয়ার্কগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল ব্যতিক্রমী। এবিসি তাদের মূল কেবল চ্যানেলে ভাষণটি না দেখিয়ে স্ট্রিমিং সার্ভিস ‘এবিসি নিউজ লাইভ’ এবং ‘এবিসি নিউজ রেডিও’-তেই তা সম্প্রচার করেছে। এনবিসি মূল চ্যানেলের বদলে বিনামূল্যের স্ট্রিমিং সেবা ‘এনবিসি নিউজ নাও’-তে ভাষণ লাইভ করেছে। সিএনএন তাদের ওয়েবসাইট ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে ভিডিও সরাসরি রাখলেও মূল কেবল চ্যানেলে তা দেখায়নি। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে দর্শকসংখ্যা সাধারণত প্রধান চ্যানেল তুলনায় কম হওয়ায় ট্রাম্পের আপত্তি আরও তীব্র হয়।
ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন যে তিনি এমন কিছু গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করেছেন যা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে চীনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ দেয়। এর আগেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও ফিরিস্তিতে ২০২০ সালের নির্বাচনে বেইজিংয়ের কোনো হস্তক্ষেপের প্রমাণ মেলেনি বলে উল্লেখ রয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট ভাষণের আগে জানিয়েছিলেন যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী নিরাপত্তার পাশাপাশি ইরান পরিস্থিতি ও অর্থনীতি নিয়েও কথা বলবেন। ভাষণে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অবস্থার প্রশংসা এবং নির্বাচনী জালিয়াতি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলো পুনরাবৃত্তি করেন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজসহ অনেকে সরাসরি সম্প্রচারের বিরোধিতা করেছেন, তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে ট্রাম্প ভিত্তিহীন বক্তব্যের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারেন। অন্যান্য নেটওয়ার্কের অবস্থানও ভিন্ন ছিল: সিবিএস ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করলেও প্রতি পনেরো মিনিটে ট্রাম্পের দাবির সত্যতা যাচাই করে বিশ্লেষণ দেখায়; ফক্স নিউজ সম্পূর্ণ বক্তব্য কোনো কর্তন ছাড়াই সরাসরি প্রচার করেছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক চাপ নিয়ে নতুন বিতর্ক জাগেছে। এফসিসি বর্তমানে এবিসি ও এনবিসির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত পরিচালনা করছে বলে জানানো হয়েছে। এফসিসির চেয়ারম্যান ব্রেন্ডান কার বিতর্কের মাঝে বলেছেন, জনগণের জানার অধিকারের স্বার্থে প্রেসিডেন্টের এ ধরনের ভাষণ সম্প্রচার করা উচিত ছিল।
সংক্ষেপে, ভাষণ না সম্প্রচারের ঘটনার পর ট্রাম্পের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি এবং এর পরবর্তীকালে উত্থাপিত আইনি-রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রে তুমুল বিতর্কের বিষয়।







