জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, ইরান-সংক্রান্ত সংঘর্ষ দীর্ঘায়িত হলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে পড়তে পারে। সংস্থাগুলো বলছে, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও খাদ্যের খরচ বাড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে এমন দেশগুলোই বেশি সমস্যায় পড়বে যা জ্বালানি তেল বেশির ভাগই উপসাগরীয় অঞ্চলের কাছ থেকে আমদানি করে।
এই আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব כבר পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়ায় এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ৯ শতাংশের ওপরে টিকে থাকার একটি ধারাবাহিকতা নির্দেশ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বুধবার (৬ মে) এপ্রিলের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। মার্চে মূল্যস্ফীতি ৮.৭১ শতাংশ ছিল; এরপর টানা কয়েক মাসে ওঠানামার পর এপ্রিল মাসে আবার বাড়তি চাপ দেখা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, সাম্প্রতিক জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাংলাদেশে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। গত ১৯ এপ্রিল সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়; তাতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকায় দাঁড়ায়। জ্বালানি খরচ বাড়ায় পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা শেষপর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায়।
বিবিএসের বিবরণ অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৫৭ শতাংশ। গ্রাম-শহর—উভয় অঞ্চলেও সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। গত দুই সপ্তাহে জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে শাকসবজির দাম কেজিতে ১০–১৫ টাকা পর্যন্ত বাড়েছে; মাছ ও মাংসের দামও বাড়তে দেখা গেছে। একদিকে চালের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর চাপ বাড়ছে।
দুই মাসের মধ্যে জাতীয় গড় মজুরি ৮.১৬ শতাংশ বাড়ায়া গেলেও তা মূল্যস্ফীতির গতিবেগের চেয়ে কম—ফলে বাস্তবে লোকেদের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, আয়ের গতি যদি মূল্যস্ফীতির সঙ্গী না হয়, মানুষকে ধার-দেনা করতে হবে বা খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ কমাতে হবে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রাথমিক সতর্কতা আরও ভয় দেখাচ্ছে। আইএমএফ ও জাতিসংঘের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান-ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কিত সংঘর্ষ বিশ্ববাজারে সার, তেল ও গ্যাস সরবরাহকে বিঘ্নিত করে ফসল উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে; এমনকি কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা বলা হয়েছে। এভাবে খাদ্য-সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি তীব্রতর হবে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) পূর্বাভাস দিয়েছে, ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিশ্বের প্রায় ৩২ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যার মধ্যে ৮.৮ মিলিয়ন মানুষই এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের। ইউএনডিপি সতর্ক করেছে—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, ঝুঁকিপূরণ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার-ব্যবসাকে সুরক্ষা দেওয়াসহ সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে, তেল ও সার সরবরাহে বিঘ্ন হলে খাদ্য সংকট বিপর্যয়কর পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)ও বলেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন এশিয়ার প্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনবে এবং আঞ্চলিক মূল্যস্ফীতি বাড়াবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নীতি নির্ধারকদের সামনে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চ্যালেঞ্জ আছে—লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা, জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা-শিল্পকে সহায়তা দেওয়া দরকার, না হলে সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও দরিদ্রতা বাড়বে।
সংক্ষেপে, আন্তর্জাতিক উত্তেজনার ছায়ায় তেল, সার ও খাদ্যের গ্লোবাল সরবরাহ বিঘ্নিত হলে সেটি সোজাসুজি বাংলাদেশের বাজার ও সাধারণ মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক চাপে রূপ নেয়—এটা বড় ধরনের নীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার পরীক্ষার সময়।









