ঢাকা | রবিবার | ৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২১শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ঐতিহাসিক বাজেটের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হচ্ছে—দেশ ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেটের অপেক্ষায়। রোববার (৭ জুন) বিকাল ৩টায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের আহ্বানে সংসদে শুরু হয়েছে বহুল প্রতিক্ষিত বাজেট অধিবেশন। আগামী ১১ জুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পেশ করবেন।

এটি নতুন রাজনৈতিক মণ্ডলীর গঠনের পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর তৈরি হওয়া সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। সরকারি সূত্র বলছে, বাজেটের সম্ভাব্য আকার আছে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি থেকে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা; কিছু প্রাথমিক প্রাক্কলনে এটি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ধাক্কা খেয়েছে। চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে এটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হবে।

সরকারি বর্ণনায় এই মেগা বাজেটের মূল লক্ষ্য—অর্থনীতিকে সাহসীভাবে ঘুরিয়ে দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়কে স্থিতিশীল করা এবং বৈষম্য কমিয়ে সাম্যের অর্থনীতি গঠন। সরকারের নতুন অর্থনৈতিক দর্শনকে তারা ডেকে পাঠিয়েছেন ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’। অর্থাৎ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সুফল যেন কেবল কয়েকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছায়।

বাজেটের আকার যেমন বড়, তেমনি এর লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। প্রস্তাবিত কয়েকটি মূল অংক ও নীতি এইভাবে:

– রাজস্ব আহরণ লক্ষ্য প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা; করজাল সম্প্রসারণ ও দুর্নীতিমুক্ত রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলা হবে।

– বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) প্রস্তাবিত আকার ~৩ লাখ কোটি টাকা; অনুৎপাদনশীল খাতের খরচ কমিয়ে জনকল্যাণমুখী ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানো হবে।

– মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্বাভাবিকীকরণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ড: প্রান্তিক মানুষের সরাসরি সুরক্ষা বাড়াতে বাজেটে জনপ্রতিধানমূলক কিছু সংস্কার আনা হচ্ছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবার এবং গৃহিণীদের সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে—রাজনৈতিক প্রভাব ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা শূন্য করে। কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালু করে তাদেরকে ভর্তুকি সার-বীজ, স্বল্প সুদে ঋণ ও অন্যান্য সরকারি প্রণোদনা সরাসরি প্রদান করা হবে। সরকার মনে করে কৃষি খাতের আধুনিকায়ন ছাড়া স্থায়ীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।

মানবসম্পদে জোর: শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসাবে এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের বরাদ্দ এক লাফে বাড়িয়ে ৩৫,৪০৩ কোটি থেকে ৪২,১৪০ কোটি করা হচ্ছে (প্রায় ১৯% বৃদ্ধি)। প্রাথমিক শিক্ষার ADP ১১,৩৯৮ কোটি থেকে ১৬,৪৮৪ কোটি করা হয়েছে—প্রায় ৪৫% বাড়তি বরাদ্দ। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বরাদ্দও বাড়ছে। স্বাস্থ্যখাতে ইউনিভার্সাল ও প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সম্প্রসারণে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে জনগণের ‘আউট অব পকেট’ চিকিৎসা ব্যয় কমে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিওদের শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে।

সৃজনশীল অর্থনীতির উদ্ভাবন: বাজেটের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’কে স্বীকৃতি দেয়া—শিল্পকর্মী, তাঁতি, ক্ষুদ্রকারিগর, নাট্যকর্মী ও অন্যান্য সৃজনশীল পেশাজীবীদের দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ শর্তে ঋণ, ডিজাইন সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারজাতকরণে সহায়তা করে তাদের অর্থনীতিতে সংযুক্ত করা হবে।

দফতরি জটিলতা কমানো ও নজরদারি ব্যবস্থা: বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়াতে সরকার ‘লাইসেন্স রাজ’ ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—অপ্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বিলম্ব কমিয়ে ব্যবসা-ব্যবস্থাকে প্রায় নিয়মিত সময়সীমার মধ্যে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। প্রকল্প পর্যবেক্ষণ ও স্বচ্ছতার জন্য ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে, যাতে উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি কেন্দ্র থেকে দেখা যায় এবং অনিয়ম বা বিলম্ব হলে দ্রুত এন্তরজ্ঞান করা যায়। পুঁজিবাজারে আস্থার জন্য বিএসইসির পুনর্গঠন নিয়ে কাজ শুরু হবে—নিরপেক্ষ ও পেশাদার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিতে প্রায় ৭ লক্ষ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আদায় করা বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া দুর্নীতি, তৃণমূল পর্যায়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতা পুরোপুরি না নির্মূল করলে ফ্যামিলি কার্ড কিংবা ড্যাশবোর্ডের সদ্ব্যবহার ব্যর্থতা দেখা দিতে পারে। তাই বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি কঠোর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও তদারকিই হবে সরকারের বড় পরীক্ষা।

সংসদ ভবনের নিরাপত্তা জোরদার: ঐতিহাসিক এই বাজেট অধিবেশনকে সামনে রেখে শেরেবাংলা নগর ও পারিপার্শ্বিক এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সংসদ এলাকা ঘিরে অস্ত্র বহন, মিছিল ও জনসভা নিষিদ্ধ করেছে। সংসদ সচিবালয় বলেছে অধিবেশন সুষ্ঠু পরিচালনার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন।

পটভূমি: মনে রাখা ভালো, গত ১২ মার্চের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে গঠিত ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনটি ২৫ কার্যদিবস ধরে চলে এবং ঐতিহাসিকভাবে ৯৪টি বিল পাস ও ১৩৩টি জরুরি অধ্যাদেশ উত্থাপনের রেকর্ড রাখে। এখন নতুন বাজেটের বাস্তব প্রভাব ও দলীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বাইরে স্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারকে কঠোর বাস্তবায়ন ও তদারকায় মনোনিবেশ করতে হবে।