ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

খুনোখুনিতেও কিশোর গ্যাংয়ের অস্ত্রও ফোটছে

পড়ার টেবিল ছেড়ে ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাং। প্রতিদিনই তারা ছিনতাই, চুরি, মারামারি এবং খুনের মতো নৃশংস অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। তাঁদের হাতে উঠছে চাপাতি, পিস্তল, রিভলবারসহ বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র, যা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব অপরাধের কারণে পাড়া-মহল্লা বা শহরগুলোতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ নিয়ে এই কিশোর গ্যাংগুলো নতুন নতুন সংগঠন গড়ে তুলেছে। ফলে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তাদের হিরোইজম দেখানোর জন্য চাপাচাপি, ছিনতাই, মাদক কারবার এবং এমনকি খুনোখুনিতেও লিপ্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন শহর এবং পাড়া-মহল্লায় এই অপরাধের ঘটনা বেড়েই চলেছে। সমাজের সব স্তরে মাদক প্রবক্তির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় কিশোররাও বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে তাদের জন্য অপরাধ করা যেন গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সহজ এবং স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের পরে, সারাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব বেড়ে চলেছে। গত ২০ মাসে নিত্যনতুন অপরাধে জড়িত হয়ে, এই গ্যাং সদস্যদের হাতে খুন হয়েছে অন্তত ২৪ জন। বিগত ১৬ বছরে এই সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০০। সর্বশেষ বুধবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল (২৮) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে গ্যাং সদস্যরা। এর আগে, একই এলাকায় মোবাইল ফোন চুরির ঘটনায় প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে আহত করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে চার সদস্যকে।

অন্যদিকে, শেরপুরের নকলায় কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয় সজীব মিয়া (১৪)। রাতে, তার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার কথা বলে তাকে ডেকে নিয়ে যায় একই এলাকার মো. রিফাত ও আরও তিন-চারজন। একপর্যায়ে, এক মোবাইল ফোন হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে, তর্কাতর্কির মধ্যে সজীবের শরীরে ছুরিকাঘাত করা হয়। খানিকক্ষণ পরে, এলাকাবাসীদের সহযোগিতায় তাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায়, তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, কিন্তু সেখানে চার দিন হাসপাতালে থাকাকালীন সে মারা যায়।

এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, কিশোর গ্যাং দ্বারা সংঘটিত হত্যা বা নৃশংস অপরাধ প্রায় দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এসব গ্যাং ছাড়াও, নানা ধরনের অপরাধে জড়িত থাকছে। আগের সময়ে যেসব গ্যাং ছিল, এখন আরও আধুনিক, সংগঠিত ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের স্বীকার, রাজধানীর অপরাধের প্রায় ৪০ শতাংশই এখন কিশোর গ্যাং এর তত্ত্বাবধানে, যার মধ্যে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ছোটখাটো ব্যবসায়ীদের হয়রানি উল্লেখযোগ্য। তারা দেশীয় অস্ত্র ছাড়াও বিদেশি পিস্তল ও আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। মাদক পরিবহন ও ব্যবসাতেও যুক্ত তারা। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল, আপত্তিজনক ছবি শেয়ার এবং হ্যাকিংয়ের মতো দুষ্চর্য কাজেও তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।

তথ্য বলছে, সারাদেশে বর্তমানে ২৩৭টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর ১১৮টি, চট্টগ্রামে ৫৭টি গ্যাং কার্যক্রম চালাচ্ছে। কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল এবং ময়মনসিংহেও এদের কার্যক্রম চরম আকারে বেড়ে চলেছে, প্রতিটি গ্যাংয়ে সদস্যের সংখ্যা ৭ থেকে ২০ জনের মধ্যে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অনুসারে, বিভিন্ন বিভাগে গত দুই বছরে মোহাম্মদপুরসহ মহানগরীর বহু এলাকায় গ্যাংয়ের সদস্য অনতিপর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন গ্যাং গঠন এবং অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। মানসিক ও শারীরিক দিক থেকে বিপজ্জনক এই গ্যাংগুলো ক্রমশ সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া, বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ বা প্রভাবের কারণে কিশোরদের উপর অতিরিক্ত প্রভাব পড়ছে। তাদের গঠনমূলক কাজে উৎসাহিত না করে, রাজনৈতিক আর্থিক স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অবস্থায়, তাল মিলিয়ে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরে যুবকদের গঠনমূলক দিকের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। অন্যথায়, এই গ্যাংগুলোর হুমকি ভবিষ্যতেও সমাজের জন্য বড় আতঙ্ক হয়ে থাকবেই।