ঢাকা | শনিবার | ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রেরণ করল জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ খসড়া

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সোমবার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ, সমন্বিত ও সংশোধিত খসড়া পাঠিয়েছে। খসড়াটি নিয়ে যে কোনো মতামত আগামী ২০ আগস্ট বিকেল চারটার মধ্যে কমিশনের কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।

গতকাল রাতেই কমিশন থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। খসড়াটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এতে রয়েছে একটি বিস্তারিত পটভূমি তুলে ধরা, বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের গঠন ও কার্যকলাপের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, ঐকমত্যে উপনীত হওয়া বিষয়সমূহ এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আট দফা অঙ্গীকারনামা।

পটভূমিতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের নীতির ওপর ভিত্তি করে গৃহীত মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার আকাঙ্ক্ষা আজও সম্পূর্ণরূপে অর্জিত হয়নি। কারণ, শাসন ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও সংস্কৃতির বিকাশ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

খসড়ায় বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের নানা কর্মকাণ্ডেরও উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে অবশিষ্ট গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবনতি ঘটিয়ে অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী কার্যক্রম চালিয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের হরণ, গুম, খুন, নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা-মকদ্দমাসহ নানা অত্যাচার চালিয়ে একটি নৈরাজ্যকর ও ত্রাসের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে খসড়ায় সংসদের দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংশোধনে গণভোট বাধ্যতামূলক, জরুরি অবস্থা ঘোষণায় মন্ত্রিসভার অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা, জরুরি অবস্থাকালে মৌলিক অধিকার সীমাবদ্ধ না করা, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হবার সময় রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের পদ না রাখা, প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ ১০ বছর দায়িত্ব পালন করার বিধানসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা দিক আলোচনায় উঠেছে।

এছাড়াও সংসদ ভঙ্গের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিয়ম, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ এবং অতিরিক্ত ৩০ দিনের ধারাবাহিক বিধানগুলোও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

খসড়ায় রাষ্ট্রভাষা, নাগরিকত্ব, সংবিধান, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ব্যবস্থাসহ আইনসভা, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক অধিকার বিষয়ক মোট ৮৪টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখানে প্রতিটি বিষয়ের ওপরে ঐকমত্য এবং রাজনৈতিক দলের মতামত স্পষ্ট করা হয়েছে।

সবশেষে রয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নের আট দফা অঙ্গীকারনামা, যার শুরুতেই বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে যে সাংবিধানিক ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা রক্ষা করতে হবে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে এই সনদ স্বাক্ষরিত হবে এবং এর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া হবে।

অঙ্গীকারনামার প্রধান বিষয়গুলো হলো: জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিফলন, সনদের বিধানগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ, সুপ্রীম কোর্টের মীমাংসার ক্ষমতা প্রদান, সনদটির বিধানগুলোর বৈধতাকে আইনি বাধ্যবাধকতা দেওয়া, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য স্বীকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার ও শোষিতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সূত্র জানিয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদের আইনী বাধ্যবাধকতা নিশ্চিতকরণ এবং এর সফল বাস্তবায়নের জন্য দেশ-বিদেশের সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ইতোমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। এই খসড়া রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়ে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।