নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নিয়োগ, জাতীয় সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন এবং নারীদের জন্য ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন পদ্ধতি— এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য কমিশন এখনও একমত হতে পারছে না। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত প্রায় অভিন্ন প্রস্তাব দিলেও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি দলের ভিন্নমতের কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধাগ্রস্ত কমিটি।
৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ১৯টি মূল সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে একটি জাতীয় সনদ বা রিফর্ম চার্টার চূড়ান্ত করতে চাইছে কমিশন, তবে দ্বিতীয় দফার সংলাপ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এই তিনটি ইস্যুতেই দলের মতানৈক্য প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। এই অবস্থার মধ্যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও সংসদের উচ্চকক্ষের কাঠামো নিয়ে কমিশন একাধিক সংশোধিত প্রস্তাবও দিয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিষয়টি আগে একমত হলেও প্রধান নির্বাচন প্রক্রিয়া ঘিরে মতভেদ দেখা দিয়েছে। বিএনপি প্রথমে পাঁচটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিল, জামায়াত তিনটি, পরে তারা মিলেমিশে সংশোধিত প্রস্তাব পেশ করেছে। এতে চার সদস্যবিশিষ্ট অনুসন্ধান কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যার সদস্য থাকবে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলীয়)। নির্বাচিত কমিটি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের পাঁচজন করে অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান মনোনয়ন দেবে। মতানৈক্য না হলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী কাজ হবে, তবে রাষ্ট্রপতিকে এই দায়িত্ব দেওয়া হবে না।
জামায়াত পাঁচ সদস্যের কমিটির প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে বিএনপি প্রস্তাবিত চার সদস্যের সঙ্গে জাতীয় সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম দলের একজন প্রতিনিধি থাকবেন। তারা ক্ষমতাসীন, প্রধান বিরোধী দল, তৃতীয় বৃহত্তম দল এবং অন্যান্য দল বা স্বতন্ত্রদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চান। উভয় দলই বিশ্বাস করে যে, অনুসন্ধান কমিটির সদস্যদের সম্মতির ভিত্তিতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বাছাই হওয়া উচিত।
তবে এনসিপিসহ কয়েকটি দল রাষ্ট্রপতির বিকল্প পদ্ধতি সংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে এবং র্যাংকড চয়েস ভোটিং পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছেন, যা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ প্রার্থী নির্ধারণে সহায়ক হবে। জামায়াত জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নির্বাচন হবে সম্মতির ভিত্তিতে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার নয়।
জামায়াতের কাঠামো অনুসারে জাতীয় ঐক্য কমিশনও একটি পাঁচ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটির প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের একজন করে প্রার্থী নামানোর সুযোগ থাকবে। সম্মতি না হলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল তিন-তিন জন, তৃতীয় বৃহত্তম দল দুইজন মনোনয়ন দেবে। এরপর উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন করা হবে অথবা র্যাংকড চয়েস ভোটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে প্রায় সব রাজনৈতিক দল একমত হলেও নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। জামায়াত উচ্চকক্ষ ও সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে করার প্রস্তাব দেয়, যেখানে বিএনপি চায় এই নির্বাচন নিম্নকক্ষের সদস্যসংখ্যার এড়ে আবেদন করা হোক।
জাতীয় ঐক্য কমিশন সংগ্রাম করছে দলীয় ভিন্নমত পরিহার করে নির্বাচনী সংস্কার এগিয়ে নিতে। আগামী দিনগুলোতে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য দলের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান করলেও এখনও চূড়ান্ত সমাধান টান ধরে রেখেছে।








