ঢাকা | শনিবার | ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২২শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে, ফলে মানুষ দৈনন্দিন কাজকর্ম, স্বাস্থ্য ও আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসুবিধার মুখে পড়ছে।

আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে এটি অন্যতম ভয়াবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য দেখায়, পাকিস্তানে তাপজনিত জটিলতায় অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। ভারতে হিটস্ট্রোক ও অতিরিক্ত তাপের কারণে একাধিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ, রাস্তার কাজের শ্রমিক, শিশুরা, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা—খোলা আকাশে কাজ করার সময় তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বর্ষা-আগের দুর্বল বৃষ্টি এবং এল নিনো পরিস্থিতির সমন্বয়ে এ অঞ্চলে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চচাপের বলয় বা রিজের কারণে গরম বাতাস ভূমির কাছাকাছি আটকে আছে এবং মেঘ গঠন বাধাগ্রস্ত হয়ে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়েছে।

ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে যে পশ্চিমাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা ও গুজরাটে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হতে পারে; কিছু স্থানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের আকোলা শহরে ৪৬.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে।

পাকিস্তানের করাচিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০১৮ সালের পরে সবচেয়ে বেশি। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ নাগরিকদের দিনের বেলায় বাইরে না বের হওয়া, দরকার হলে ছায়া খোঁজা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছে।

বাংলাদেশেও তাপপ্রবাহের মাত্রা বাড়ছে—আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে দেশে ২৪ দিন তাপপ্রবাহ ছিল, যা গত ৭৫ বছরের মধ্যে সর্বাধিক। রাজধানী ঢাকা, রাজশাহী, পাবনা ও ফরিদপুরে তাপমাত্রা প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে, ফলে সিটি বাসিন্দাদের পাশাপাশি মাঠে কাজ করা কৃষক ও শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

জলবায়ু গবেষকরা বলছেন, এখনকার তাপপ্রবাহ আর সাময়িক কোনো আবহাওয়াগত ঘটনা নয়—এটি ক্রমে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে কাজের সময় কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের আয় কমছে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং হাসপাতালে হিটস্ট্রোকসহ তাপজনিত অসুস্থতায় ভিড় বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা তাই আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার, নগর পরিকল্পনায় ছায়া ও সবুজায়ন বাড়ানো, শ্রমিকদের সুরক্ষা বিধান করা, স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং তাপ সহনশীল অবকাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যৎ তাপের প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব, নচেৎ আঞ্চলিক পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে।