ঢাকা শহরের অন্যতম আধুনিক ও প্রতিশ্রুতিশীল গণপরিবহনের পর্যায়ে থাকা মেট্রোরেল এখন গভীর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। মাত্র দুই বছর সারে চালু হওয়ার পর, তিলোত্তমা ঢাকার ব্যস্ত জীবনকে গতিশীল করে তোলার প্রত্যাশার মধ্যে দেখানো হয়েছিল উন্নতমানের অবকাঠামো যা দ্রুতই হয়ে উঠেছিল শহরের প্রাণধৌত সড়কজাল। তবে, সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, এই মোড়ল প্রকল্পের আড়াই বছরের মধ্যেই মারাত্মক কাঠামোগত ফাটল দেখা দিতে শুরু করেছে এবং নিরাপত্তার নানা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এরফলে, বিয়ারিং প্যাড খসে পড়ার ঘটনা, পিলারগুলোর অবস্থা বিপজ্জনক হয়ে ওঠা, ট্রেনের গতি কমে আসা এবং বৈদ্যুতিক অসুবিধাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়েছে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই সেতু-প্রকল্প।
বিশ্লেষকদের মতে, ফার্মগেটের প্রথম বিয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এরপর, ২০২৫ সালের অক্টোবরের ২৬ তারিখেই সেখানকার আরও একটি প্যাড খসে পড়ার কারণে এক পথচারীর মৃত্যু ও দুজন আহতের ঘটনা ঘটে। এটি উপলব্ধি করাতেই উচ্চ আদালত ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ঘটনা তদন্তে সামরিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে একটি ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করে। সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মেট্রোরেল এখন একটি ‘যৌগিক ঝুঁকি প্রোফাইলে’ পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন কাঠামোগত ত্রুটি ও নিরাপত্তা অবনতির আশঙ্কা প্রকট।
অডিটের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার বরাবর পরিচালিত এই রেললাইনের ৭৩০টি বিয়ারিং প্যাডের মধ্যে ২৩ শতাংশের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এর মধ্যে বেশকিছু প্যাডের অবস্থা এতই নাজুক যে, ট্রেন চলাচলের সময় তারা তীব্র ধাক্কা বা শক উপচে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৪২০ নম্বরের একটি প্যাড সম্পূর্ণ স্থানচ্যুত হয়ে গেছে, যা ট্রেন চলাচলে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
অতিরিক্ত ফাটল দেখা গেছে পিলার হেড ও গার্ডারে, যেখানে প্রকৌশলবিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ধস বা বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা প্রকাশ করতে হলে তারা নিঃসন্দেহ। বিভিন্ন স্টেশনের সিঙেল-পাইল ভিত্তি ও ব্রেসিংয়ে যথাযথ সংরক্ষণ বা উপযুক্ত সমর্থন না থাকায়, ভূমিকম্প বা বড় চাপের সময় অবকাঠামোর শক্তি প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও চালকদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ট্রেনের গতিবেগ, যা মূল নকশার ১10 কিলোমিটার ঘণ্টায় চলার জন্য তৈরি হলেও, এখন তা অনেক কমিয়ে নিয়ে ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাত্র ৪০-৫০ কিলোমিটার করে চালানো হচ্ছে। নিয়মিত যান্ত্রিক ত্রুটি, দরজার ত্রুটি, লাইনচ্যুতি ও মরচে পড়ার কারণে ইতিমধ্যে ৫টি ট্রেনের সেট সার্ভিস থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। অডিটের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ধারাবাহিক ঝাঁকুনি ও ক্ষয় হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা যেমন লাইনচ্যুতি হতে পারে, তেমনি নির্মিত কাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির প্রসার ঘটতে পারে।
ওভারহেড তারে স্পার্কিং, যার কারণে আগুনের ঝুঁকি বাড়ছে, এমনকি কয়েকটি বৈদ্যুতিক লাইন সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে কমিটি। একই সাথে, ঝড়ো বাতাস বা বজ্রপাতের সময় সাবস্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যালিং রুমগুলোতে পানি চুইয়ে পড়ার কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত কম সময়েই এই প্রকারের কাঠামোগত ক্ষতি ও ত্রুটি বিশ্বয় পর্যায়ে খুবই বিরল ঘটনা। প্রকৌশলী অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলছেন, এত অল্প সময়ে বিয়ারিং প্যাডের স্থানচ্যুতির ঘটনা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সেটি সাময়িক ব্রেক বা জরুরি মেরামতের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বিভিন্ন ব্র্যাকেট ও প্যাডে তড়িঘড়ি নতুন সমাধান চলছে। তবে, তিনি সতর্ক করে বলছেন, এটি কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। এটা কেবল মাত্র ঝুঁকি কমানোর জন্য সাময়িক পদক্ষেপ।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এই দীর্ঘ রেললাইনটির জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, নির্মাণের গুণগত মান, মানদণ্ড ও নিয়মিত তদারকি ব্যর্থ হয়েছে। এতে করে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে, যা মূল প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট ডেকে আনতে পারে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থাগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, কেবল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য নয়, বাস্তবিক উন্নতমানের পরিদর্শন ও নিরীক্ষার জন্য সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হাইকোর্টের নির্দেশে এখনও মেট্রোরেল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় ২৮টি সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যেখানে রয়েছে অতি-ঝুঁকিপূর্ণ বিয়ারিং প্যাডের দ্রুত প্রতিস্থাপন, ট্রেনের ভাইব্রেশন পরীক্ষা, কাঠামো সতর্কতামূলক মনিটরিং ও আন্তর্জাতিক মানের স্বতন্ত্র অডিট। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে অবচ্ছিন্ন মনোযোগ ও কার্যকর ফলোআপ জরুরি। ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্বের আরোপ ও কার্যকর মনিটরিং করে এই বিপদের আঁচ কমানো সম্ভব। স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, প্রতিটি দুর্বল অংশ দ্রুততার সঙ্গে মেরামত ও উন্নতমানের পরিদর্শন নিশ্চিত করা। এছাড়া, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ও কাঠামোর স্বাস্থ্যের নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করার জন্য প্রযুক্তিপ্রযুক্তি অবলম্বনের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত।
এই বিশাল প্রকল্পের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের জন্য এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে, ভবিষ্যতে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য আরও বড় বিপর্যয় হতে পারে। এর জন্য দরকার অতি দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ, কঠোর নজরদারি এবং মানসম্মত পরিদর্শন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে, জনগণের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে এবং ঢাকার মেট্রোরেল হিসেবে এটি হবে একটি স্থায়ী ও নিরাপদ চলাচলের মাধ্যম।









