অশ্রু, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শেষ বিদায় জানানো হয়েছে দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারকে। মঙ্গলবার সকাল বেলা বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজার মাধ্যমে তার মরদেহকে শ্রদ্ধার্ত জনতার সামনে রাখা হয়; পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার প্রিয় কর্মস্থলগুলোতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
বিটিভি প্রাঙ্গণে মরদেহ পৌঁছায় সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে। সঙ্গে ছিলেন দীর্ঘদিনের সহযোগী, শুভানুধ্যায়ী ও বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট মানুষরা। সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে সেখানে প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ, নাট্য ব্যক্তিত্ব ম হামিদ সহ শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু সম্মানিত ব্যক্তি।
বিটিভি থেকে মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয়। বেলা প্রায় ১১টার দিকে সেখানে স্থায়ীভাবে রাখা কফিনের সামনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ একে একে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, তারিক আনাম খান, নিমা রহমান, ত্রপা মজুমদার, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দীন স্টালিন, বরেণ্য শিল্পী মনিরুল ইসলাম, চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান, শারমিন এস মুরশীদ, কেরামত মাওলা সহ অগণিত মানুষ সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, বহু সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনও ফুলের পুষ্পস্তবক পাঠিয়ে মুস্তাফা মনোয়ারের প্রতি সম্মান জানায়। এখানে ছিল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গোলাম মোস্তফা একাডেমি, পাঠশালা, সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, প্রাচ্যনাট, বটতলা, দূরন্ত স্টেশন, বঙ্গরঙ্গ নাট্যদলসহ অসংখ্য অঙ্গন।
শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা গ্রহণ দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলার পর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজার জন্য। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ও চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে প্রিয় কর্মস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এবং বিকেলে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মুস্তাফা মনোয়ার গত সোমবার রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। দীর্ঘদিন যাবৎ বার্ধক্যসংবলিত একাধিক শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
জীবন ও কর্মে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন একান্তই বহুমুখী—শুধু চিত্রশিল্পী নন, তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণের একজন পথিকৃৎ। পাপেট থিয়েটার বা কাঠপুতুল নাট্য আন্দোলনের পথপ্রদর্শক হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন এবং শিশুদের জন্য অসংখ্য স্মরণীয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান তৈরি করেন। শিল্প ও সংস্কৃতিকে স্বাধীনতার সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তার অবদান গভীরভাবে খ্যাত। বিশেষ করে ২৩ মার্চ ১৯৭১ তৎকালীন পাকিস্তানি শাসনের নির্দেশ অমান্য করে তিনি বিটিভি সম্প্রচারে সাহসী ভূমিকা নিয়েছিলেন।
শিল্পে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিতে ২০০৪ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ত্যাগ, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যার প্রভাব আজও দেশের সাংস্কৃতিক চেতনার ওপর স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
বিদায়ী সমবেদনা জানিয়ে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি ও জনমনে তার অবলীলায় থাকা সৃষ্টি ও আদর্শ চিরস্মরণীয় থাকবে। তার স্মৃতিকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও অসংখ্য মানুষ।








