ঢাকা | শনিবার | ১৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা সফর, ১৪৪৮ হিজরি

লোভনীয় চাকরির টোপে কম্বোডিয়ায় বন্দি হচ্ছেন বাংলাদেশিরা

একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন পুষে বিদেশ যাওয়া বহু তরুণ আজ সেখানে পেয়েছে বৈদ্যুতিক শকের কালচে দাগ, জব্দ করা পাসপোর্ট ও নির্জন কক্ষে কাঁদি দিন। কম্বোডিয়ার দূরবর্তী পাহাড়ি এলাকা, সীমান্তঘেঁষা ভবন বা সিহানুকভিলের কড়া পাহারায় গড়ে ওঠা এসব “স্ক্যাম সেন্টার” এখন আধুনিক যুগের দাসত্বখানা — যেখানে চাকরির লোভে গিয়ে শতশত বাংলাদেশিকে আটকে রেখে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণা করানো হচ্ছে।

স্বপ্নভাঙা তরুণদের বর্ণনা ভয়াবহ। সিরাজগঞ্জের ২৬ বছর বয়সী তোফায়েল স্নাতক শেষ করে ঢাকায় ছোটখাটো কাজ করছিলেন। পরিবারের অভাব মেটাতে উচ্চ বেতনের কাজের প্রলোভনে ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু ও ঢাকার একজন এজেন্ট তাকে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে বিদেশ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। দালাল চক্র ৭ লাখ টাকার প্রতিশ্রুতি দাবি করে; তোফায়েল টাকা পরিশোধের পর হাতে যে ভিসা আসে, তা ছিল নির্মাণ শ্রমিকের। বিমানবন্দরে এক দালালের লোক তাকে নগদ দুই হাজার ডলারও দিয়ে যায়—যা পরবর্তীতে বোঝা যায় ছিল তাকে ‘কিনে নেওয়ার’ প্রথম কিস্তি।

নমপেনে প্রথম দুই দিন অভিজ্ঞতাটা স্বচ্ছল দেখালে ধীরে ধীরে আসল চেহারা প্রকাশ পায়। শহরের বাইরে থেকেগত ১২০–১৫০ কিলোমিটার দূরের নির্জন পাহাড়ি এলাকা বা সীমানার কাছে কড়া পাহারাবেষ্টিত বহুতল ভবনে নেওয়া হয় তাদের। এলে সঙ্গে সঙ্গে পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন এবং বিমানবন্দর থেকে পাওয়া নগদ টাকা জব্দ করা হয়। এরপর বলা হয়—“এখানে তোমাকে বিক্রি করা হয়েছে; আমরা যা বলি তাই করতে হবে।”

স্ক্যাম সেন্টারগুলোকে এক ধরনের কোরিয়ার্ড দুর্গ বলা যায়। চারপাশে কাঁটাতার, সশস্ত্র প্রহরী, সিসিটিভি; জানালায় লোহার গ্রিল, কর্মীদের বাইরে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই। সেখানে প্রতিদিন ১২–১৬ ঘণ্টা কাজ করানো হয়। প্রধান কাজ—‘লাভ স্ক্যাম’ বা রোমান্টিক প্রতারণা: সুন্দরীর ছদ্মনামে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ডেটিং অ্যাপে ফেক প্রোফাইল তৈরি, জাতিসংঘীয় কাঠামোর মতো লক্ষ্যভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ (প্রধানত ইউরোপ, আমেরিকা বা উন্নত দেশের একাকী অবসরপ্রাপ্ত মানুষ), দিনের পর দিন ভরসা করে প্রেমঘটানো এবং তাদেরকে ভুয়া ক্রিপ্টো বা বিনিয়োগে টাকা দেওয়ার ফাঁদে ফেলা। শেষে হ্যাকারদের সহায়তায় টার্গেটের ব্যাংক একাউন্ট খালি করে দেয়া হয়।

জোরপূর্বক কাজ করাতে না পারলে ঘটে কটু নির্মমতা। তোফায়েল ও মানিকগঞ্জের তালাতসহ বিবিধ প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী বন্দিদের নির্জন ঘরে বেঁধে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, হকিস্টিক দিয়ে পেটান, একমাত্র শুকনো নুডলস দিয়ে দিন কাটানো এবং মাঝে মাঝে পানিও বন্ধ করে দেওয়া হত। নারীরা স্বত্বেও একই রকম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন; অনেকেই বছরভর বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।

এ নরকখান থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় প্রায়শই মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ বা নিজস্ব উদ্যোগে বাংলাদেশ থেকে টাকা আনা। তোফায়েল শেষ পর্যন্ত নিজের উপায়ে টাকা এনে মুক্তি পেয়েছেন; তবু পাসপোর্ট ও বৈধ ভিসা সংগ্রহে সমস্যায় পড়েছেন। কম্বোডিয়ায় ভিসার মেয়াদ শেষ হলে প্রতিদিন জরিমানা ধার্য করা হয়—অনিয়মিত অবস্থায় দীর্ঘদিন থাকায় জরিমানা গুণতে হয়েছে অনেককে। বাংলাদেশ দূতাবাস, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় নিয়মিতভাবে উদ্ধার ও প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ চলছে—সম্প্রতি সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায় ১ জুলাই ১০ জন নারীসহ ১০৯ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যে সম্প্রতি মোট ৫৮৩ জন বাংলাদেশি ফিরে এসেছে। আবার ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের তথ্য অনুযায়ী বিগত দেড় বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন—তবে এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে কতজন এখন স্ক্যাম সেন্টারে আটক, তার সঠিক হিসাব মেলানো কঠিন।

আইনি ও প্রশাসনিক বাধা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিআইডির মানবপাচার ইউনিট জানায়, বোঝাপড়া ও মামলা করার ব্যাপারে ভুক্তভোগীরা দ্বিধাগ্রস্ত—অনেকেই মনে করেন মামলা করলে হয়রানি বাড়বে; ফলে অনেকেই দালালের কাছেই আশ্রয় খোঁজে। পাচারকারীরা কৌশল বদলাচ্ছে—সরকার যখন কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামে ভিসা যাচাই কড়া করেছে, তখন তারা জাল BMET কার্ড ব্যবহার করছে বা কর্মীদের প্রথমে থাইল্যান্ডে পাঠিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে কম্বোডিয়ায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার কিছু গলদও দালালদের কাজে লাগে: বিশেষ স্থানে দাঁড় করিয়ে বোর্ডিং পাস করিয়ে দেওয়ার নানা অভিযোগ রয়েছে।

এসব পরিস্থিতি দেখে প্রতিকার দরকার। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শুধু নীতি কড়াকড়ি যথেষ্ট নয়—বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তা ঝুঁকি গোনা, দূতাবাস ও কনসুলেট পর্যায়ে দ্রুত সহযোগিতা, ট্রান্সন্যাশনাল তদন্ত ও মানবপাচার রোধে আন্তঃসরকারি সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে—সরকারি স্মার্ট কার্ড বা BMET ক্লিয়ারেন্স থাকলেই চাকরিটি নিঃসন্দেহে বৈধ হবে, এমন অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার “আইটি সেক্টর” বা “কম্পিউটার অপারেটর” প্ররোচনায় যুবসমাজকে শতভাগ সতর্ক থাকতে হবে।

চাকরির টোপে ছাঁদ কাটানো একটা জীবন কখনোই অক্লেশে ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়—সঠিক তথ্য, শক্ত আইনি প্রতিকার ও তহবিলবদ্ধ প্রত্যাবর্তন কার্যক্রম ছাড়া বহু তরুণের জীবন ট্র্যাজেডিতেই রয়ে যাবে। সরকারি-দলীয় ও ব্যক্তিগত স্তরে এখনই ব্যাপক সতর্কতা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক।