ঢাকা | শনিবার | ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১লা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

স্পেনে অভিবাসীদের গণবৈধকরণ কার্যক্রম শুরু

স্পেনের বামপন্থী সরকারের গণবৈধকরণ পরিকল্পনার ঘোষণা ও কার্যক্রম শুরুতে নথিহীন হাজার হাজার অভিবাসীর মধ্যে আশা আর উদ্বেগ একসঙ্গে প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবেদন জমা দিতে সক্রিয়ভাবে নথিপত্র গোছাতে এবং প্রমাণ সংগ্রহে অনেকেই রীতিমতো দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন।

মাদ্রিদের পেরুভিয়ান কনস্যুলেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ২৮ বছর বয়সী ম্যাডেলিন কাস্তিলো এএফপিকে জানালেন, ‘সবকিছুতে শুধু সমস্যা’—তিন সন্তানের এই মা কনস্যুলার নথি সংগ্রহ করে নিজের নাগরিকত্ব ও পরিচয় প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। তিনি বললেন, ‘বলা হচ্ছে সব কিছুই বিনামূল্যে করা হবে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে আইনজীবীর সাহায্য ছাড়া এগোতে কষ্ট হয়।’

আরেকদিকে, উল্টো চিত্রও আছে। মাদ্রিদ আঞ্চলিক সরকারের অফিস থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে আসছিলেন ৩০ বছর বয়সী কলম্বিয়ান নারী ক্যারোলিনা (ছদ্মনাম)। তিনি গণপরিবহন সাবস্ক্রিপশন ও কার্ড নবায়নের কাগজপত্র সংগ্রহ করেছেন। এ প্রকল্পে আবেদন করার অন্যতম শর্ত হলো স্পেনে অন্তত টানা পাঁচ মাসের থাকার প্রমাণ দেখানো, যা যাতায়াত সংক্রান্ত রসিদ বা রেকর্ডের মাধ্যমে সহজে মঞ্জুর করা যায়।

দেড় বছর ধরে স্পেনে থাকা ক্যারোলিনা বলেন, ‘এটি আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। সাধারণ নিয়মে আবাসন অনুমতি পেতে আমাকে এখনও দুই বছর অপেক্ষা করতে হতো। জানুয়ারি মাসে এই বিশেষ প্রকল্পের কথা জানar পর আমার আইনজীবীই আমাকে কাগজপত্রগুলো দ্রুত গোছাতে বলেছিলেন।’

ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় স্পেন এই নথিহীন অভিবাসী বিষয়ক নীতিতে শিথিলতা এনেছে; অনুমান করা হচ্ছে এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বৈধ হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন, যাদের বড় অংশ লাতিন আমেরিকার নাগরিক। বড় শহরগুলোতে লাতিন আমেরিকা ও উত্তর আফ্রিকার দূতাবাসের সামনে লম্বা সারি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

অনেকে তাদের অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে সুপারমার্কেট লয়্যালটি কার্ড, দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর রসিদ বা সরকারি হাসপাতালের পুরোনো অ্যাপয়েন্টমেন্টের তথ্যও জমা দিচ্ছেন—কারণ স্পেনে নথিহীনদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য থাকায় সেই রেকর্ডও প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে।

এই সপ্তাহের শুরুতে আইনে পরিণত হওয়া এক আদেশ অনুযায়ী আবেদনকারীদের স্পেন বা তাদের নিজ দেশে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা চলবে না এবং জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মত কোনো ইতিবাচক তথ্য থাকলেই আবেদন নাকচ হবে। এছাড়া আবেদনকারীর প্রোফাইল অনুযায়ী আগের কাজের অভিজ্ঞতা বা পারিবারিক অবস্থার প্রমাণও চাওয়া হতে পারে।

কিন্তু প্রত্যেকের কাছে বিষয়টি সোজা লাগছে না। কলম্বিয়ার বোগোটা থেকে এসেছেন ৩৮ বছর বয়সী আলেজান্দ্রা—নতুন কলম্বিয়ান পাসপোর্ট পেয়েও তাঁর স্বামীর পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় তাঁর উচ্ছ্বাস ম্লান। আলেজান্দ্রা বলেন, ‘আমি আশ্রয়প্রার্থী হওয়ায় আমার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আছে। কিন্তু আমার স্বামীর কাছে সব কাগজ নেই, তাই তিনি কাজ পাচ্ছেন না; সার্টিফিকেট পাওয়া ও জব পাওয়া দুটোতেই তার জন্য সমস্যা হচ্ছে।’

আবেদন প্রক্রিয়া গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত চলবে। আবেদন জমা দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে বলে জানানো হয়েছে। বিশাল এই প্রশাসনিক কাজ সামলাতে সরকার এক বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে—অভিবাসনমন্ত্রী এলমা সাইস জানিয়েছেন যে সামাজিক নিরাপত্তা, ডাক সেবা ও অভিবাসন দপ্তরের প্রায় ৪৫০টি শাখা বাড়তি সময় খোলা রাখা হচ্ছে এবং শুধু এ কাজে নিয়োজিত হওয়ার জন্য অতিরিক্ত ৫৫০ জন কর্মী নেওয়া হয়েছে।

আইনি সহায়তা দানকারী প্রতিষ্ঠান ‘এক্সট্রানজারিয়া ক্লারা ডটকম’-এর পরিচালক গুইলার্মো ভালদেরাবানো বলেন তাদের কাছে প্রতিদিন প্রায় ৪০০টি ফোন আসে সহায়তার জন্য। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়েও এই ধরনের প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়। এখন নতুন জনবল এই চাপ কতটা সামলাতে পারবে, তা সময়ই বলবে।’ ভালদেরাবানো আরও বলেন কেবল আবেদনসংখ্যাই নয়, নথিপত্রগুলোর সঠিক মূল্যায়ন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাই বড় চ্যালেঞ্জ এবং অতীতে ঠিক সেখানে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়েছিল।

সরকারি উদ্যোগ ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি সত্ত্বেও অনেক অভিবাসীর জন্য এখনই সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে নিজেদের কাগজপত্র দ্রুত ও সঠিকভাবে সংগ্রহ করা—যা তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নির্ধারণ করবে।