ঢাকা | বুধবার | ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১২ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

কালের পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে লাঙল-জোয়ালের ঐতিহ্য

গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে মাছের পর মাঠ, যেখানে এখন আধুনিক যন্ত্রের ছোঁয়ায় চলছে চাষাবাদ। তবে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই পরিচিত দৃশ্য—লাঙল টেনে নিয়ে গরুর জোয়ালে বাঁধা কৃষকের ঘামে ভেজা মাঠ। এক সময় যা ছিল বাংলার গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেই লাঙল-জোয়ালের ব্যবহার আজ কেবল স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ।

এক যুগে বাংলার কৃষিকাজ বোঝাত লাঙল-জোয়ালের যুগল প্রয়োগ। কৃষকের শক্ত হাতে লাঙলের হাতল ধরা, গরুর ঘাড়ে জোয়াল অবধি বাঁধা, আর জমির কোণে কোণে কাঁদামাটির গন্ধ—এসবই ছিল বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণপিণ্ড। কৃষকের বিশ্বাস, লাঙল দিয়ে জমি চাষ করলে তা উর্বর হয় এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।

বর্তমানে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও অন্যান্য আধুনিক যন্ত্র এসে জমির কাজকে সহজ, কম সময়সাপেক্ষ এবং শ্রম কমাতে সাহায্য করছে। এরই ফলে অনেক কৃষক ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি পরিত্যাগ করে যান্ত্রিক চাষাবাদের দিকে ঝুঁকেছেন। কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে শুধু লাঙল-জোয়াল হারিয়ে যাচ্ছে না, মাটির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আজও কিছু প্রবীণ ব্যক্তি লাঙল-জোয়ালের দিনগুলো মনে করে তাদের কথা শোনানো যায়, “গরুর জোয়ালের আওয়াজে যেন মাঠে প্রাণ ফিরে আসত। লাঙলের ফলা মাটি ছিঁড়ে যখন কাটত, তখন মনে হতো জমির সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তা গড়ে উঠছে।” এই স্মৃতিগুলো এক জনর নয়, বরং বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে একটি গভীর সংযোগ।

যান্ত্রিক পদ্ধতির চাষাবাদ যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে, গরুর সংখ্যা কমে যাওয়ায় গোবর সার তৈরির প্রথাগত পদ্ধতিও বিলীন হতে বসেছে। লাঙল-জোয়ালের ব্যবহার ছিল শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তি নয়; এটি মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয়ের নিদর্শন।

লাঙল-জোয়ালের হারিয়ে যাওয়া শুধু একটি কৃষি প্রক্রিয়ার পরিবর্তন নয়, এটি একটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির হারানো। এই ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন হয়তো কঠিন, তবে আমাদের অবশ্যই স্মৃতিতে এই ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে হবে। হয়তো একদিন কেউ আবার প্রথাগত পদ্ধতির দিকে ফিরে তাকাবেন এবং বাংলার মাটিতে সেই পুরোনো দিনের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনবেন। লাঙল-জোয়াল হারিয়ে গেলেও স্মৃতির কোণে তার স্থান চিরস্থায়ী থাকবে, আর এই ঐতিহ্যের গল্প যেন কখনো ভুলে যাওয়া না হয়।