ঢাকা | শনিবার | ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

কুড়িগ্রামে পানি কমলেও তিস্তা পাড়ে ভাঙনের শঙ্কায় মানুষ

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অতিবৃষ্টির প্রভাবে কুড়িগ্রামের ১৬টি নদ-নদীতে বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল। গত শুক্রবার থেকে এসব নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, যা নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর বয়ে এনেছে। যেমন, দুধকুমার নদীর পানি হঠাৎ ১৬ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৯ সেন্টিমিটার নিচে নামলো। পাশাপাশি তিস্তা, ব্রহ্মপূত্রসহ অন্যান্য নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে।

তবে পানি কমলেও তিস্তা নদী অববাহিকায় কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে একশরও বেশি পরিবার ভাঙনের ভয়ঙ্কর ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা ও বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন এবং উলিপুরের থেতরাই ও বজরা ইউনিয়নে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। বজরার কালপানি বজরা ও সাধুয়াদামারহাট গ্রামে নদী ভাঙনের কারণে অনেক সড়ক ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেছে।

বজরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাইয়ুম সর্দার জানিয়েছেন, ভাঙন প্রতিরোধে ঠিকাদার নিয়োগ করা হলেও পানি বৃদ্ধি থাকায় কাজ শুরু করতে পারেনি ঠিকমতো। এই কারণে এ সপ্তাহে ভাঙনে ৬টি বাড়ি নদীর ঢলে হারিয়েছে। বর্তমানে আরও ১০টি বাড়ি সহ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাঙনের কবলে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। কালপানি বজরা ও সাধুয়াদামারহাটের বাড়িসমূহের মধ্যে শাহজাদি, আশরাফুল, হান্নান, মুকুল, মজিদা ও রোসনার বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে।

সাতালষ্কার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আনোয়ারা জানিয়েছেন, কাল যে রাস্তা দিয়ে স্কুলে গিয়েছিলেন, আজ সেই রাস্তা নদী ভাঙনের কারণে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। তাঁদের স্কুল দুটি যে কোন সময় নদীগর্ভে চলে যেতে পারে বলে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন তিনি।

সাধুয়াদামারহাট গ্রামের ফুলবাবু জানান, তার ২ বিঘা জমি নদী ভাঙনের কারণে হারিয়েছে। তার মতো আরও অনেকের বসত বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তিনি সরকার থেকে দ্রুত ভাঙন রোধে কাজ করার দাবি জানিয়েছেন।

প্রতিবর্তে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নয়ন কুমার সাহা জানিয়েছেন, ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং জনপ্রতিনিধিদের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের কাছে ৩২০টি শুকনা খাবার প্যাকেট রয়েছে এবং জিআর চাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আবার দুধকুমার নদীর পানিবৃদ্ধির কারণে নিম্নাঞ্চলে পানির ঢল প্রবেশ শুরু হলেও শুক্রবার থেকে পানি কমতে শুরু করার ফলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত দুধকুমার নদীর পানি বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হয়েছিল, যা শুক্রবারে ১৬ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৯ সেন্টিমিটার নিচে নেমে আসে। তবে জলাবদ্ধতার কারণে নাগেশ্বরী উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি জমা রয়েছে এবং কিছু বাড়ি জলাবদ্ধতার শিকারে পড়েছে বলে জানা গেছে।

নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিব্বির আহমেদ জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন এলাকা যাচাই করে দেখছেন ও বাড়ি তলিয়ে যাওয়ার কোন তথ্য না পেলেও কিছু নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন সরকার জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের কাছে ২,৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৪৪০ মেট্রিক টন জিআর চাল এবং ১৪ লাখ টাকা নগদ অর্থ মজুদ রয়েছে। তালিকা পেলেই দ্রুত এসব সরঞ্জাম বিতরণের কাজ শুরু করা হবে। এছাড়া প্রতিটি উপজেলায় প্রত্যেককে ৩২০ প্যাকেট শুকনো খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি ও তিস্তা নদীর ভাঙন কুড়িগ্রামের অনেক মানুষের জীবন যাপনকে বিপন্ন করে তুলেছে। কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয়রা একসাথে কাজ করে দ্রুত সমস্যা মোকাবিলায় এগিয়ে আসছেন। তবে নিরাপদ আশ্রয় ও ভাঙনরোধী কার্যক্রম নেওয়ার মাধ্যমে বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অতীব জরুরি হয়ে উঠেছে।