ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ৫ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৬ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য; ইরানে নিহত সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন দাবি

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা পঞ্চম দিনে পৌঁছেছে এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ছে—তেহরান থেকে তেল আবিব, রিয়াদ থেকে বেইরুত, দুবাই থেকে নিকোশিয়া পর্যন্ত অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিক্রিয়াশীল হামলা ও প্রতিহামলা জারি রয়েছে এবং এ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে মৃত্যু-হতাহতের সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন দাবি করা হচ্ছে।

কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান সংঘাতে ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪৫ জনে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্যে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৮৭ জন নিহত বলে জানানো হয়েছে। ফলে আনুষ্ঠানিক ও স্বাধীন প্রতিবেদনে সংখ্যাগুলো মিলে না; পরিস্থিতি অস্থির থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত তথ্যও পরিবর্তিত হচ্ছে।

এদিকে, ইরান সমর্থিত ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী সারায়া আওলিয়া আল-দাম দাবি করেছে তারা জর্ডানের ভেতরে এক ‘গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালিয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—বুধবার (৪ মার্চ) এই হামলার কথা বলা হয়েছে; গোষ্ঠীটি তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে আকাশপথে অস্ত্র নিক্ষেপের একটি ফুটেজ শেয়ার করেছে, কিন্তু নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর পরিচয় স্বীকার করেনি।

ওই দিন ভোরে ইসরায়েল জরুরি সতর্কতা জারি করে বাসিন্দাদের আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেই হুমকি প্রতিহত করার চেষ্টায় কাজ করছে। জেরুজালেম ও তেল আবিবসহ বেশিরভাগ এলাকায় সতর্কতা জারি করা হলেও ইসরায়েলের জরুরি চিকিৎসা সংস্থা মাগেন ডেভিড অ্যাডোম জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

আল জাজিরার রামাল্লাহ প্রতিনিধি নিদা ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, আমরা অত্যন্ত ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি—সম্ভবত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত হওয়ার কারণে। তিনি বলেন, এটি এতটাই জোরালো ছিল যে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, জেরুজালেমের পশ্চিমে বেইত শেমেশ এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে; ঠিক ওই এলাকায় কয়েক দিন আগে নয়-জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই সংঘাত এক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তেহরানও ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের প্রতিশোধমূলক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে বলে জানানো হয়েছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আল‑খারজ গভর্নরেটের ওপর দিয়ে উড়ে আসা দুইটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। কুয়েতও তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা বেশ কিছু শত্রুভাবাপন্ন উড়োজাহন ধ্বংস করার দাবি করেছে।

ইরানের রাজধানী তেহরানে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে; ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে তারা তেহরানে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি—ইরানের বিপ্লবী গার্ডের স্বেচ্ছাসেবী শাখা বাসিজের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ভবন ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কমান্ডের দফতরগুলিতেও আঘাত হানা হয়েছে।

ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানজুড়ে অন্তত ৭৮৭ জন নিহত হয়েছে—তবে অন্যান্য সূত্রে উচ্চতর সংখ্যা বলা হচ্ছে, তাই সঠিক গণনা এখনও নিশ্চিত নয়। তেহরান থেকে আল জাজিরার তৌহিদ আসাদি জানান, তেহরান ছাড়াও কারাজ ও ইসফাহানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর আছে। আইআরজিসি জানিয়েছে তাদের স্থল বাহিনী অপারেশন শুরু করেছে এবং প্রায় ২৩0টি ড্রোন এই লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছে; পাশাপাশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে নৌ-অভিযান চালানোর কথাও বলা হয়েছে। তৌহিদ আসাদি বলেন, তেহরানে শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না—বরং সংঘাত ছড়িয়ে পড়াটাই এখন প্রধান প্রবণতা।

একই সময় কাতার জানিয়েছে, তাদের আঞ্চলিক বিমানঘাঁটি আল‑উদেইদের উপর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে—ইরান থেকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল; একটিকে মধ্যপথে ধ্বংস করা হয়, আর দ্বিতীয়টি দোহার দক্ষিণ-পশ্চিমের ওই ঘাঁটির উপর পড়ে। কোনো হতাহতের খবর নেই। বিবৃতিতে কাতার তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সক্ষমতা ও কঠোর প্রতিক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছে এবং নাগরিক ও দর্শনার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে কোনো বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিনা তা স্পষ্ট করা হয়নি।

পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল; বিভিন্ন রিপোর্টে ঘটনার পরিধি ও হতাহতের সংখ্যা মিলছে না। স্থল, বায়ু ও সমুদ্রে সীমান্ত পার হয়ে ছড়িয়ে পড়া এই সংঘাতে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চরিত্র জটিল হয়ে উঠেছে এবং অনিশ্চয়তা কন্ট্রোলের বাইরে বাড়ছে। পরিস্থিতি তদন্ত ও যাচাই পর্যায়ে রয়েছে—নির্ভুল অল্পতম তথ্যের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও স্বীকৃত সংবাদ সংস্থার আপডেট দেখাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।